টানা চার দিনের ভারী বর্ষণে নোয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। নিচু এলাকার অনেক বসতবাড়ি, আঙিনা ও কৃষিজমিতে পানি জমে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। অব্যাহত বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি উজান থেকে নেমে আসা ঢলের আশঙ্কায় জেলার মানুষের মধ্যে আবারও বন্যা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার অভিজ্ঞতা এখনও তাজা থাকায় পরিস্থিতি নিয়ে উৎকণ্ঠা বাড়ছে।
বুধবার (৮ জুলাই) জেলা সদর, বেগমগঞ্জ, সেনবাগ, চাটখিল, সোনাইমুড়ী, কবিরহাট, কোম্পানীগঞ্জ ও হাতিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সড়কে পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। অনেক স্থানে বসতবাড়ির আঙিনা, পুকুর, মাছের ঘের ও কৃষিজমিতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। কোথাও কোথাও ড্রেনেজ ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় অল্প বৃষ্টিতেই দীর্ঘ সময় ধরে পানি জমে থাকছে।
টানা বৃষ্টির কারণে রাস্তাঘাটে চলাচলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন পথচারী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষ। অনেক এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও রিকশা চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে বাজারে ক্রেতার উপস্থিতিও কমে গেছে।
জেলা সদরের এক বাসিন্দা বলেন, “চার দিন ধরে সূর্যের মুখ দেখা যাচ্ছে না। বৃষ্টি থামলেই মনে হয় পানি নামবে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার শুরু হয়। রাস্তাঘাটে হাঁটাচলা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে।”
সেনবাগ উপজেলার এক কৃষক বলেন, “আমনের বীজতলা ও সবজিক্ষেতে পানি জমে গেছে। আরও কয়েক দিন এভাবে বৃষ্টি চললে ফসলের বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।”
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রিকশাচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “বৃষ্টির কারণে যাত্রী কমে গেছে। সারাদিন রিকশা চালিয়েও আগের মতো আয় হচ্ছে না। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।”
চাটখিল উপজেলার এক স্কুলশিক্ষার্থী জানায়, “টানা বৃষ্টির কারণে নিয়মিত স্কুলে যেতে পারছি না। এতে পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে। ২০২৪ সালের মতো ভয়াবহ বন্যা আবার হলে অনেক মানুষ বিপদে পড়বে, এ নিয়ে ভয়ও কাজ করছে।”
এদিকে, নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দারা জানান, বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে অনেক পরিবারকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হতে পারে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
নোয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস. এম. রিফাত জামিল বলেন, “বর্তমানে নোয়াখালী অঞ্চলে বন্যার কোনো তাৎক্ষণিক ঝুঁকি নেই। তবে টানা বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে জেলার বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা বাড়তে পারে।”
তিনি জানান, জেলার নদ-নদীর পানির স্তর বর্তমানে বিপৎসীমার প্রায় ১ দশমিক ২৫ মিটার নিচে রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৩৫ থেকে ৯৫ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে নোয়াখালী সদরে ৯৫ মিলিমিটার এবং হাতিয়ায় ৪৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে নদীভাঙন প্রতিরোধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোথাও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি কোনো খাল, কালভার্ট বা পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ থাকার তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে, আবহাওয়া অধিদপ্তর দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোর জন্য ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রেখেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে আগামী কয়েক দিন নোয়াখালীসহ উপকূলীয় অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। তাই অপ্রয়োজনে জলাবদ্ধ এলাকায় চলাচল না করা এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
