কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীতে গবাদিপশুর মধ্যে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ (এলএসডি)। এর সঙ্গে দেখা দিয়েছে ক্ষুরা রোগও। এতে ব্যাপক হারে গরু মারা যাওয়ায় চরম উদ্বেগে পড়েছেন প্রান্তিক খামারিরা।
খামারিদের দাবি, বর্তমানে মোট গবাদিপশুর প্রায় ২০ শতাংশ এলএসডি ও ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে লাম্পিতে আক্রান্ত পশুর প্রায় ৮০ শতাংশই মারা যাচ্ছে।
একমাত্র প্রতিষেধক ভ্যাকসিন হলেও সরকারি পর্যায়ে তা মিলছে না। বেসরকারি ভ্যাকসিন পাওয়া গেলেও দাম স্বাভাবিকের তুলনায় ১৩ থেকে ১৫ গুণ বেশি হওয়ায় তা কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন খামারিরা।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার তেওয়ারিগঞ্জ ইউনিয়নের আন্ধারমানিক গ্রামের আছিয়া বেগমের মতো অনেকেই এখন দিশেহারা। স্বামীর আয় না থাকায় ১৫টি গরুর খামারই ছিল তার একমাত্র ভরসা। কিন্তু হঠাৎ রোগে একটি গরু মারা গেছে, বাকি গরুগুলোর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে সংক্রমণ। কীভাবে বাঁচাবেন, তা নিয়ে তিনি চরম অনিশ্চয়তায়।
একই গ্রামের কোরবান আলীর ৬টির মধ্যে ৫টি গরু মারা গেছে মাত্র এক সপ্তাহে। মনিজা বেগম ও নুরুল আমিন হারিয়েছেন দুটি করে গরু। স্বামী পরিত্যক্তা মিলন বেগম ১০ দিনের ব্যবধানে দুটি গরু হারিয়ে এখন বাকি দুটির জীবন বাঁচাতে লড়ছেন।
কমলনগর উপজেলার তোরাবগঞ্জ গ্রামের খামারি ইসমাইল হোসেন শ্যামলের প্রায় ২ লাখ টাকা মূল্যের একটি গরু ইতোমধ্যে মারা গেছে। অন্যগুলোও অসুস্থ। একই গ্রামের নাছিমা বেগমের ৮টি গরুই এখন আক্রান্ত। গত এক সপ্তাহে চিকিৎসায় ৩০ হাজার টাকা ব্যয় করেও কোনো উন্নতি হয়নি বলে জানান তিনি।
পল্লী পশু চিকিৎসকদের ভাষ্য, রোগটি দ্রুত গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে। রামগতি উপজেলার চর আলগী ইউনিয়নে গত এক মাসে অন্তত ৩০টি গরু মারা গেছে। কমলনগর উপজেলায় গত দুই মাসে প্রায় ১ হাজার গবাদিপশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
লাইভস্টক সার্ভিস প্রোভাইডার (এলএসপি) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে অনেক এলাকায় মোট পশুর প্রায় অর্ধেকই আক্রান্ত। বিশেষ করে বাছুর মৃত্যুর হার বেশি।
খামারিরা জানান, আগে সরকারি ভ্যাকসিনের এক ভায়াল (১০০ পশুর জন্য) দাম ছিল ৪০০ টাকা।
এখন তা বাজারে নেই। বেসরকারি কোম্পানির ভ্যাকসিনে ১০টি পশুকে টিকা দিতে খরচ হচ্ছে ২ হাজার ৬০০ টাকা, যা অনেকের নাগালের বাইরে। ফলে সময়মতো টিকা না পেয়ে রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
লক্ষ্মীপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম ফজলুল হক বলেন, লাম্পি একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ।
এতে জ্বর, ত্বকে গুটি, মুখ দিয়ে লালা ঝরার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। কিছু পশু মারা গেছে, তবে সঠিক পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই বলে জানান তিনি। সরকারি সরবরাহ সীমিত হলেও বেসরকারি ভ্যাকসিন বাজারে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে মাঠ পর্যায়ের খামারিদের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় ভ্যাকসিন অপ্রতুল এবং সরকারি সহায়তা কার্যত নেই। অনেক এলাকায় পশু চিকিৎসকদের উপস্থিতিও দেখা যায় না।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, লক্ষ্মীপুরে প্রায় ২ হাজার ৫০০ নিবন্ধিত খামারি রয়েছে। দ্রুত ভ্যাকসিন সরবরাহ ও জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা না গেলে আসন্ন কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে খামারিদের বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

