বর্তমান সময়ে প্রেম, সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার নামে তরুণ-তরুণীদের একাংশ এমন সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যার প্রভাব শুধু তাদের নিজেদের জীবনেই নয়, গভীরভাবে আঘাত হানছে তাদের পরিবারেও।
বিশেষ করে মা-বাবা, যারা সন্তানের জন্য জীবনের সর্বস্ব ত্যাগ করেন, অনেক ক্ষেত্রে তারাই সন্তানের অবাধ্যতা, উপেক্ষা ও ভুল সিদ্ধান্তের কারণে জীবন্ত লাশের মতো বেঁচে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রযুক্তির উন্নয়ন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার এবং অবাধ যোগাযোগের সুযোগ তরুণদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলাকে সহজ করেছে।
ভালোবাসা মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি, এতে দোষের কিছু নেই। ইসলামও ভালোবাসাকে অস্বীকার করেনি। বরং ভালোবাসাকে সম্মানজনক ও পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ করার জন্য বিয়ের বিধান দিয়েছে। কিন্তু সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয়, যখন আবেগ বিবেককে অতিক্রম করে যায় এবং সাময়িক অনুভূতি মা-বাবার ভালোবাসা, অভিজ্ঞতা ও ত্যাগের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন:
“তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তোমরা তাঁরই ইবাদত করো এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করো।” (সূরা আল-ইসরা: ২৩)
লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের নির্দেশ দেওয়ার পরপরই পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের কথা উল্লেখ করেছেন।
এটি ইসলামে মা-বাবার মর্যাদা কতটা উচ্চ, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ।
একজন মা দশ মাস দশ দিন সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন।
সীমাহীন কষ্ট সহ্য করে পৃথিবীর আলো দেখান। একজন বাবা নিজের স্বপ্ন, ইচ্ছা এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার সংগ্রাম চালিয়ে যান।
সন্তানের একটি হাসির জন্য তারা কত রাত নির্ঘুম কাটিয়েছেন, কত কষ্ট নীরবে বয়ে বেড়িয়েছেন, তার হিসাব কোনো সন্তানই কখনো পূর্ণভাবে দিতে পারবে না।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে আজ অনেক তরুণ-তরুণী কয়েক মাস বা কয়েক বছরের সম্পর্কের আবেগে এমনভাবে নিমজ্জিত হয় যে, মা-বাবার অশ্রু, কষ্ট কিংবা উদ্বেগ তাদের কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়। তারা ভুলে যায়, যে মানুষগুলো জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত নিঃস্বার্থভাবে পাশে ছিল, তাদের চেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী পৃথিবীতে আর কেউ নেই।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“পিতার সন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহর অসন্তুষ্টি।” (জামে তিরমিজি)
তরুণ বয়স আবেগের বয়স। এই সময়ে বাহ্যিক সৌন্দর্য, মিষ্টি কথা, স্মার্টনেস, জনপ্রিয়তা কিংবা সাময়িক আকর্ষণ অনেক কিছুই সত্য বলে মনে হয়।
কিন্তু সংসার জীবন বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সেখানে প্রয়োজন চরিত্র, দায়িত্ববোধ, ধৈর্য, পারিবারিক মূল্যবোধ, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা এবং দ্বীনের প্রতি আন্তরিকতা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বিয়ের ক্ষেত্রে দ্বীনদারিতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন:
“নারীকে চারটি বিষয়ের কারণে বিয়ে করা হয়: সম্পদ, বংশমর্যাদা, সৌন্দর্য ও দ্বীনদারিতা। তুমি দ্বীনদার নারীকে প্রাধান্য দাও, তাহলে সফল হবে।” (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
আজকের বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক সম্পর্ক গড়ে ওঠে আবেগের ভিত্তিতে, কিন্তু ভেঙে যায় বাস্তবতার আঘাতে। কারণ সম্পর্কের শুরুতে যেসব বিষয় আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল, সংসার জীবনে সেগুলোর অনেকগুলোরই কোনো মূল্য থাকে না। তখন প্রকাশ পায় চরিত্র, মূল্যবোধ এবং দায়িত্ববোধের প্রকৃত গুরুত্ব।
অভিভাবকরা সন্তানের শত্রু নন। তারা কখনো সন্তানের অকল্যাণ চান না। বরং জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে তারা এমন অনেক বিষয় বুঝতে পারেন, যা আবেগপ্রবণ একজন তরুণ বা তরুণীর পক্ষে বুঝে ওঠা কঠিন। তাই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি, অর্থাৎ জীবনসঙ্গী নির্বাচন করার ক্ষেত্রে তাদের মতামত ও পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন:
“তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেও না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট পথ।” (সূরা আল-ইসরা: ৩২)
এই আয়াত শুধু ব্যভিচারকে নিষিদ্ধ করেনি, বরং সেই পথে নিয়ে যায় এমন সব দরজা ও পরিস্থিতি থেকেও দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
ভালোবাসা যদি সত্যিই পবিত্র হয়, তবে তা কখনো মা-বাবার চোখের জল, পরিবারের ভাঙন কিংবা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে না।
প্রকৃত ভালোবাসা সম্মান শেখায়, দায়িত্ব শেখায় এবং হালাল পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করে।
তাই তরুণ সমাজের প্রতি আহ্বান, আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করুন, অনুভূতিকে অস্বীকার নয় বরং সঠিক পথে পরিচালিত করুন। যদি কাউকে ভালো লাগে, তবে গোপন সম্পর্কের পরিবর্তে পরিবারকে জানান, মা-বাবা,পরিবার এর সঙ্গে কথা বলুন, তাদের পরামর্শ নিন।
মনে রাখবেন, জীবনের পথে হোঁচট খেলে অনেকেই পাশে না-ও থাকতে পারে, কিন্তু মা-বাবা শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সন্তানের কল্যাণই কামনা করেন।
সাময়িক আবেগের কাছে আত্মসমর্পণ করে মা-বাবাকে কষ্ট দেওয়ার আগে একবার ভাবুন, আপনার একটি সিদ্ধান্ত হয়তো তাদের বুকের ভেতর এমন ক্ষত তৈরি করছে, যা কখনোই শুকাবে না।
সন্তানের সুখের জন্য যারা সারাজীবন নিজেদের উৎসর্গ করেছেন, তাদের জীবন্ত লাশ বানিয়ে কোনো সুখই প্রকৃত সুখ হতে পারে না।
আবেগ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মা-বাবার দোয়া ও ভালোবাসা আজীবনের সম্পদ। তাই এমন পথ বেছে নিন, যা দুনিয়ায় সম্মান এবং আখিরাতে সফলতা এনে দেয়।
