বর্তমান সমাজে প্রেম-ভালোবাসার সম্পর্ককে কেন্দ্র করে পরিবার, বিশেষ করে মা-বাবার প্রতি অবাধ্যতার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কৈশোর ও তারুণ্যের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো আবেগ, কৌতূহল এবং বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ।
কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এই আবেগই বাস্তবতাকে আড়াল করে দেয় এবং তরুণ-তরুণীদের এমন সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করে, যার প্রভাব তাদের পুরো জীবনজুড়ে বহন করতে হয়।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েদের শিক্ষার হার বেড়েছে, কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগও আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে ছেলে-মেয়েরা একে অপরের সঙ্গে সহজেই পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
ফেসবুক, ইমো, এক্স (টুইটার) ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম তাদের মধ্যে যোগাযোগকে আরও সহজ করে তুলেছে।
এটি স্বাভাবিক এবং আধুনিক সমাজের অংশ হলেও সমস্যা সৃষ্টি হয় তখন, যখন অপরিপক্ব আবেগকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ভিত্তি বানানো হয়। যে বয়সে অধিকাংশ তরুণ-তরুণী প্রেমে পড়ে, সে বয়সে তারা পৃথিবীকে অনেকটাই রঙিন চোখে দেখে। ফলে বাহ্যিক সৌন্দর্য, স্মার্টনেস, কথাবার্তা, পোশাক, জনপ্রিয়তা কিংবা সাময়িক আচরণ দেখে একজনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে কল্পনা করে ফেলে।
কিন্তু বাস্তব জীবন শুধুমাত্র আবেগ বা আকর্ষণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। সংসার টিকে থাকে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, দায়িত্ববোধ, শিক্ষা, মূল্যবোধ, পারিবারিক পরিবেশ, আত্মসম্মানবোধ, সহনশীলতা এবং একে অপরকে বোঝার ক্ষমতার ওপর। দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রেমের সম্পর্কের শুরুতে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনেক সময়ই গুরুত্ব পায় না।
বর্তমানে সমাজে পারিবারিক কলহ, বিবাহবিচ্ছেদ, প্রতারণা, মানসিক নির্যাতন, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পেছনেও অপরিণামদর্শী সম্পর্ক ও ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাব দেখা যায়। যদিও সব প্রেমের সম্পর্ক ব্যর্থ হয় না, তবে আবেগপ্রসূত এবং যাচাই-বাছাই ছাড়া নেওয়া সিদ্ধান্তের ঝুঁকি অনেক বেশি।
এখানেই অভিভাবকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একজন মা-বাবা সন্তানের শত্রু নন; বরং তারাই সন্তানের সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী। তারা জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে মানুষের চরিত্র, পারিবারিক পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে অনেক বাস্তব মূল্যায়ন করতে পারেন। তাই জীবনসঙ্গী নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের মতামত ও পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
এর অর্থ এই নয় যে সন্তানের পছন্দের কোনো মূল্য নেই। বরং একজন তরুণ বা তরুণী যদি সত্যিই কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে ভাবেন, তাহলে বিষয়টি পরিবারকে জানিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।
গোপনীয়তা, পালিয়ে যাওয়া বা সম্পর্কের কারণে পরিবার থেকে দূরে সরে যাওয়া কখনোই দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল বয়ে আনে না।
ইসলামেও পিতা-মাতার মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে বারবার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ ও আনুগত্যের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সহিহ বুখারির এক বর্ণনায় এসেছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদের ওপর মা-বাবার অবাধ্যতাকে হারাম করেছেন।”
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর উম্মতকে বহুবার সতর্ক করেছেন যে, পিতা-মাতার অবাধ্যতা মানুষের জন্য দুনিয়া ও আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতির কারণ হতে পারে।
আজকের তরুণ সমাজকে তাই আবেগ ও বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
ভালোবাসা মানবিক অনুভূতি, কিন্তু সেই ভালোবাসা যেন মা-বাবার কষ্ট, পারিবারিক বন্ধন কিংবা নিজের ভবিষ্যৎ ধ্বংসের কারণ না হয়।
জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আবেগের পাশাপাশি বিবেক, অভিজ্ঞতা এবং অভিভাবকদের পরামর্শকে প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন।
কারণ সাময়িক আবেগের চেয়ে পিতা-মাতার ভালোবাসা অনেক গভীর, অনেক নিঃস্বার্থ এবং অনেক বেশি কল্যাণকর। তাই আবেগে অবাধ্য হয়ে দুনিয়া ও আখিরাতের ক্ষতির পথে না গিয়ে, পরিবার ও মূল্যবোধকে সঙ্গে নিয়েই সুন্দর ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়াই হওয়া উচিত প্রতিটি তরুণ-তরুণীর লক্ষ্য।
