আফনান মেহমুদ তান্নুর,
সহ-সভাপতি, গ্রীণ শ্যাডো-সোসাইটি,
পরিচালক–অন্বেষা একাডেমিক কেয়ার
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নোয়াখালী ও ফেনী অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে সম্ভাবনার আলোচনায় থাকলেও বাস্তব উন্নয়নের ক্ষেত্রে এখনো কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে পারেনি। অথচ ভৌগোলিক অবস্থান, প্রবাসী-নির্ভর অর্থনীতি, কৃষি ও উপকূলীয় সম্পদের প্রাচুর্য—সব মিলিয়ে এই অঞ্চলকে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক বলয়ে রূপান্তর করা সম্পূর্ণ সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, বরং একটি সমন্বিত, স্থানভিত্তিক ও বাস্তবমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা।
যোগাযোগই অর্থনীতির প্রাণশক্তি:
এই অঞ্চলের উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হচ্ছে কার্যকর যোগাযোগ অবকাঠামো। ফেনী থেকে সোনাগাজী হয়ে কোম্পানীগঞ্জ ও মাইজদী পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলা গেলে এটি শুধু দুই জেলার মধ্যে সংযোগই বাড়াবে না, বরং ঢাকার সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করে শিল্প ও বাণিজ্যের জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দেবে। ফেনী যেহেতু ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার, তাই এখানে একটি আধুনিক লজিস্টিক হাব বা ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো গড়ে তোলা গেলে চট্টগ্রাম বন্দরের উপর চাপ কমানো সম্ভব হবে এবং পুরো অঞ্চলটি একটি বিকল্প বাণিজ্য রুট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
পরিপূরক শিল্পায়ন, প্রতিযোগিতা নয়:
শিল্পায়নের ক্ষেত্রে ফেনী ও নোয়াখালীকে প্রতিযোগী নয়, বরং পরিপূরক অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ফেনীর সোনাগাজী ও আশপাশের এলাকাগুলোতে ভারী ও মাঝারি শিল্পের সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে, বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও গ্যাসভিত্তিক শিল্পের জন্য। অন্যদিকে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ, চৌমুহনী ও কোম্পানীগঞ্জ এলাকায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, গার্মেন্টস এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের বিকাশ ঘটানো বেশি যৌক্তিক। চৌমুহনী ঐতিহাসিকভাবে একটি বাণিজ্যকেন্দ্র, তাই এটিকে আধুনিক ট্রেড ও ডিস্ট্রিবিউশন হাবে রূপান্তর করা গেলে আঞ্চলিক অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে।
কৃষি থেকে শিল্পে রূপান্তরের সময়:
এই অঞ্চলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে কৃষিকে শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করা অপরিহার্য। সোনাইমুড়ী, সেনবাগ, চাটখিল এবং ফেনীর দাগনভূঞা অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন ব্যাপক হলেও সেগুলোর সঠিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাব রয়েছে। এখানে কোল্ড স্টোরেজ, আধুনিক ফুড প্রসেসিং শিল্প এবং রপ্তানিমুখী কৃষিপণ্য উৎপাদনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
উপকূলেই লুকিয়ে আছে বড় অর্থনীতি:
নোয়াখালী–ফেনী অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র হলো উপকূলীয় ও সামুদ্রিক অর্থনীতি। হাতিয়া, সুবর্ণচর এবং সোনাগাজী উপকূলকে কেন্দ্র করে একটি পরিকল্পিত ব্লু ইকোনমি গড়ে তোলা গেলে এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের খাতে পরিণত হতে পারে। আধুনিক মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, কোল্ড চেইন, ছোট আকারের ফিশিং হারবার এবং উপকূলীয় সড়ক নির্মাণ এই খাতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি নিঝুম দ্বীপসহ উপকূলীয় চরাঞ্চলে পরিবেশবান্ধব পর্যটন গড়ে তোলা গেলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
দক্ষ জনশক্তিই টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি:
মানবসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া কোনো অর্থনৈতিক পরিকল্পনা টেকসই হতে পারে না। মাইজদী ও ফেনী শহরকে কেন্দ্র করে টেকনিক্যাল শিক্ষা, আইটি প্রশিক্ষণ এবং মেরিন ও ফিশারিজ শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো গেলে একটি দক্ষ কর্মশক্তি তৈরি হবে, যা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে। একইসঙ্গে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও পরিকল্পিত নগরায়ন এই অঞ্চলকে বসবাস ও বিনিয়োগের জন্য আরও উপযোগী করে তুলবে।
বিমানবন্দর: প্রয়োজন নাকি আবেগ?
বিমানবন্দর নির্মাণের বিষয়টি প্রায়ই আলোচনায় আসে, তবে এটি আবেগের নয়, বরং বাস্তবতার বিষয়। শিল্প, রপ্তানি ও পর্যটনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলে সুবর্ণচর বা সোনাগাজী উপকূলে একটি কার্গো বা আঞ্চলিক বিমানবন্দর গড়ে তোলা যেতে পারে। কিন্তু এর আগে যোগাযোগ, শিল্প ও লজিস্টিক অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
প্রবাসী ও উদ্যোক্তাই পরিবর্তনের চালিকাশক্তি:
এই পুরো উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় প্রবাসী ও স্থানীয় শিল্পপতিদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নোয়াখালী ও ফেনী অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক প্রবাসী শুধু রেমিট্যান্স প্রেরণেই সীমাবদ্ধ না থেকে যদি উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ করেন, তবে তা এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে আমূল বদলে দিতে পারে। একইভাবে স্থানীয় শিল্পপতিরা নিজ অঞ্চলে শিল্প স্থাপন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এগিয়ে এলে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি হবে। সরকার, প্রবাসী ও উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে এই উন্নয়ন পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব।
সমন্বিত পরিকল্পনাই ভবিষ্যতের চাবিকাঠি:
সার্বিকভাবে বলা যায়, নোয়াখালী ও ফেনীকে আলাদা করে নয়, বরং একটি সমন্বিত “উপকূলীয় অর্থনৈতিক বেল্ট” হিসেবে বিবেচনা করলেই এর প্রকৃত সম্ভাবনা উন্মোচিত হবে। সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই অঞ্চলটি দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
