নোয়াখালীর শেকড়, লন্ডনে বিস্তৃত পরিবার। একই পরিবারের ৪৩ সদস্য বর্তমানে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরে বসবাস করছেন। চাকরি, ব্যবসা ও উচ্চশিক্ষার কারণে প্রবাসে স্থায়ী হলেও তারা ধরে রেখেছেন নিজেদের শেকড়, বাংলা সংস্কৃতি ও পারিবারিক ঐতিহ্য। ফলে লন্ডনের বুকে গড়ে উঠেছে যেন ‘এক টুকরো বাংলাদেশ’।
ফেনীর দাগনভূঞা ও নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের শেকড় থেকে উঠে আসা গোলাম রহমান (রহমান সাহেব) পরিবারের এই ব্যতিক্রমী গল্প এখন প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও প্রশংসিত।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, দাগনভূঞা উপজেলার এনায়েত ভূঞার বংশধর গোলাম রহমান জীবিকার সন্ধানে ১৯৫৫ সালে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। সে সময় ব্রিটেনে বাঙালি কমিউনিটি ছিল খুবই ছোট। কঠিন সংগ্রাম আর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের অবস্থান গড়ে তোলেন এবং পরিবারের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেন।
১৯৫৯ সালে তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব লাভকরেন। পরবর্তীতে তার দেখানো পথ ধরেই পরিবারের অন্য সদস্যদেরও যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। দেশে ফিরে ১৯৬৯ সালে তিনি নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সিরাজপুর ইউনিয়নের বিরাহীমপুর গ্রামে নতুন বসতি স্থাপন করেন।
তিন ছেলে ও চার মেয়ের জনক রহমান সাহেব ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক। এলাকার শিক্ষা ও জনকল্যাণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। বিরাহীমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ৪৯ ডিসমিল, কমিউনিটি ক্লিনিকের জন্য ৫ ডিসমিল এবং রহমানিয়া জামে মসজিদের জন্য ৭৫ ডিসমিল জমি দান করেন। ২০১১ সালের ১ নভেম্বর বার্ধক্যজনিত কারণে নিজ গ্রামে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০০৪ সালে রহমান সাহেবের মেজো ছেলে গোলাম মাহমুদ ও ছোট ছেলে আব্দুল কুদ্দুছ সুমন প্রথমে লন্ডনে গিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ২০০৬ সালে চার মেয়ে আশ্রাফের নেছা রুবি, শামসুর নাহার মিনা, নূর নাহার রিনা ও নূরজাহান রুনা যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। ধীরে ধীরে পরিবারের অন্য সদস্যরাও সেখানে স্থায়ী হতে থাকেন।
বর্তমানে রুবি ও মিনার পরিবারের ১৮ জন, রিনার পরিবারের ৭ জন, রুনার পরিবারের ৭জন, মাহমুদের পরিবারের ৬ জন এবং সুমনের পরিবারের ৪ জন সদস্যসহ মোট ৪৩ জন লন্ডনে বসবাস করছেন। তাদের সঙ্গে রয়েছেন পরিবারের প্রবীণ সদস্য মমতাজ বেগমও।
পরিবারটির প্রায় ৩৮ জন সদস্য বর্তমানে ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী। নতুন প্রজন্মের অনেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। কেউ ব্যবসা পরিচালনা করছেন, কেউ পেশাজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কয়েকজনের বিয়ে হয়েছে যুক্তরাজ্যেই, সামনে রয়েছে আরও কয়েকটি পারিবারিক আয়োজন।
প্রবাসে থাকলেও পরিবারটির সদস্যরা বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে আগলে রেখেছেন। ঈদ, বিয়ে কিংবা বিশেষ পারিবারিক অনুষ্ঠানে সবাই একত্রিত হন। তখন পুরো পরিবেশজুড়ে তৈরি হয় বাংলাদেশি আবহ। রান্না হয় পিঠা-পুলি, বিরিয়ানি, ভর্তাসহ দেশীয় নানা খাবার। নতুন প্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করাতেও পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
লন্ডনপ্রবাসী আশ্রাফের নেছা রুবি বলেন, “আমাদের বাবা সবসময় চাইতেন পরিবার একসঙ্গে থাকুক। বিদেশে থেকেও আমরা সেই পারিবারিক বন্ধন ধরে রাখার চেষ্টা করছি। বাবার কষ্ট ও পরিশ্রমের ফলেই আজ পরিবারের সবাই ভালো অবস্থানে রয়েছে।”
নূরজাহান রুনা বলেন, “আমরা নতুন প্রজন্মকে বাংলা সংস্কৃতি শেখানোর চেষ্টা করি। বিদেশে থেকেও যেন তারা নিজেদের শেকড় না ভুলে যায়, সেটাই আমাদের লক্ষ্য।”
লন্ডনে বার ট্রেনিং কোর্সের শিক্ষানবিশ আইনজীবী কাজী ইমদাদুল হক তানিম বলেন, “পরিবারটির সদস্যরা নিয়মিত দেশে অর্থ পাঠানোর পাশাপাশি গ্রামের বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডেও সহযোগিতা করেন। প্রবাস জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও তারা দেশের প্রতি ভালোবাসা ও পারিবারিক ঐক্যের অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।”
প্রবাসে থেকেও শেকড়ের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখা, পারিবারিক ঐক্য অটুট রাখা এবং বাংলা সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে রহমান সাহেবের পরিবার আজ অনেকের কাছেই অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। লন্ডনের বুকে তারা সত্যিই গড়ে তুলেছেন ‘এক টুকরো বাংলাদেশ’।

