নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফিরছে না। চিনির দাম বাড়ার পাশাপাশি চাল, ডাল, আটা-ময়দা, মাছ, মাংস ও বিভিন্ন সবজির চড়া দামে চাপে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।
আয়-ব্যয়ের সঙ্গে বাজারের হিসাব মেলাতে গিয়ে অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারকে প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকা ছোট করতে হচ্ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত দুই সপ্তাহে খোলা চিনির দাম কেজিতে প্রায় ১৫ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে খোলা চিনি ১১৫ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মোড়কজাত চিনির সরবরাহও কমে যাওয়ায় অনেক ক্রেতাকে একাধিক দোকান ঘুরে পণ্য কিনতে হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, মোহাম্মদিয়া হাউজিং লিমিটেড বাজার ও টাউন হল বাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
চিনির বাজারে সরবরাহ সংকট-
বিক্রেতারা বলছেন, কোম্পানি পর্যায় ও পাইকারি বাজারে চিনির দাম বাড়ার পাশাপাশি মিল গেট থেকে সরবরাহও আগের তুলনায় কমেছে। ফলে এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে।
অধিকাংশ দোকানে খোলা চিনি ১১৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও কোথাও কোথাও ১২০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে খোলা চিনির দাম ছিল ১১০ থেকে ১১৫ টাকা এবং তার আগের সপ্তাহে ১০০ থেকে ১০৫ টাকা।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের এক বিক্রেতা জানান, দুই সপ্তাহে পাইকারি পর্যায়ে ৫০ কেজির এক বস্তা চিনির দাম প্রায় ৬৫০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে এক বস্তা কিনতে সাড়ে ৫ হাজার টাকার বেশি খরচ হচ্ছে।
কিছু দোকানে মোড়কজাত লাল চিনি পাওয়া গেলেও এর দাম তুলনামূলক বেশি। প্রতি কেজি ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
চাল,ডালের দামও বাড়ছে-
চিনির পাশাপাশি চালের বাজারেও বাড়তি চাপ দেখা গেছে। সাম্প্রতিক বাজারদরের হিসাবে এক সপ্তাহের ব্যবধানে কিছু ধরনের চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বিআর-২৮ চাল কয়েকদিন আগে ৫২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও এখন তা ৫৫ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। স্বর্ণা চালের সরবরাহ কম থাকায় অন্যান্য মোটা চালের দামেও প্রভাব পড়েছে।
তবে সরু চালের দামে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা রয়েছে। বাজারে মিনিকেট চাল ৬৮ থেকে ৭০ টাকা এবং নাজিরশাইল ৭৫ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
ডালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা
মসুর ডালের বাজারেও বেড়েছে দাম। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের মসুর ডালের দাম কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
বর্তমানে মোটা মসুর ডাল ৯৫ থেকে ১০৫ টাকা, মাঝারি মানের মসুর ডাল ১১৫ থেকে ১২০ টাকা এবং ভালো মানের সরু দানার মসুর ডাল ১৩৫ থেকে ১৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগেও এসব ডালের দাম তুলনামূলক কম ছিল।
মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই-
মাছের বাজারেও ক্রেতাদের জন্য স্বস্তির খবর নেই। বাজারভেদে মাছের দামে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা, পাঙাস ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা এবং রুই-কাতল ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বড় আকারের রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা, পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা এবং ট্যাংরা প্রায় ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চিংড়ির দাম মান ও আকারভেদে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
বিক্রেতাদের ভাষ্য, মাছের দাম মূলত সরবরাহ ও চাহিদার ওপর নির্ভর করে। ফলে একই মাছের দাম সকাল ও বিকেলে কিংবা এক বাজার থেকে অন্য বাজারে কিছুটা পরিবর্তিত হচ্ছে।
মাংসের দামও চড়া-
মাংসের বাজারেও উল্লেখযোগ্য স্বস্তি নেই। রাজধানীর বাজারে ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক বাজারদরে দেশি মুরগি ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকা, গরুর মাংস প্রায় ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। বাজার ও মানভেদে এসব পণ্যের দামে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।
ডিমের দামও এখনো তুলনামূলক বেশি। বর্তমানে ফার্মের মুরগির ডিম প্রতি ডজন ১৫০ টাকা এবং চারটি ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
বেড়েছে আটা-ময়দার দাম-
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, এক সপ্তাহের ব্যবধানে খোলা আটা ও ময়দার দাম কেজিতে প্রায় ৩ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে খোলা আটা ৪৮ থেকে ৫০ টাকা এবং ময়দা ৬৫ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এক মাসের ব্যবধানে মোড়কজাত আটার দামও কেজিতে প্রায় ১০ টাকা বেড়েছে।
কিছু পণ্যে মিলছে স্বস্তি-
নিত্যপণ্যের সব ক্ষেত্রে দাম বাড়েনি। কিছু পণ্যের দাম কমেছে। পেঁয়াজের দাম কেজিতে প্রায় ৫ টাকা কমে ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় নেমেছে। রসুন ও আমদানি করা আদার দামও কমেছে।
সবজির বাজারেও কয়েকটি পণ্যে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। সরবরাহ বাড়ায় পেঁপে, পটল, ঢ্যাঁড়স, কাঁকরোল, ঝিঙে ও জালির মতো কয়েকটি সবজির দাম কমেছে। তবে বেগুন, টমেটো ও শিমের দাম এখনো তুলনামূলক বেশি। রাজধানীর বাজারে শিম ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং টমেটো ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে পেঁপে ৩০ টাকা এবং পটল, ঢ্যাঁড়স, কাঁকরোল ও ঝিঙে প্রায় ৬০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে। কাঁচা মরিচের দামও সরবরাহ বাড়ায় কমে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজিতে নেমেছে।
কমছে ক্রয়ক্ষমতা, বাড়ছে সংসারের চাপ!
বাজারের সামগ্রিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, কিছু পণ্যের দাম কমলেও চাল, ডাল, চিনি, আটা-ময়দা, মাছ ও মাংসের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য ক্রেতাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
বিশেষ করে নির্দিষ্ট মাসিক আয়ের পরিবারগুলোকে একই আয়ে বাড়তি বাজার খরচ সামলাতে হচ্ছে। ফলে অনেকে মাছ-মাংসের পরিমাণ কমাচ্ছেন, কেউ কেউ কম দামের বিকল্প পণ্য কিনছেন। প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকা ছোট করে সংসারের ব্যয় সামলানোর চেষ্টা করছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ।
বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো এবং নিয়মিত বাজার তদারকি জোরদার না হলে নিত্যপণ্যের এই বাড়তি চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ক্রেতারা।


হিমেল আহাম্মেদ 




















