বিবাহিত জীবনে স্বামী বা স্ত্রীর বাইরে অন্য কারও সঙ্গে প্রেম বা শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়াকে সাধারণভাবে ‘পরকীয়া’ বা ‘বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক’ বলা হয়। বিষয়টি শুধু পারিবারিক বা সামাজিক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বিভিন্ন দেশে এর সঙ্গে আইন, নৈতিকতা ও পারিবারিক অধিকারের প্রশ্নও জড়িত।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ‘পরকীয়া’ শব্দটি সরাসরি কোনো স্বতন্ত্র অপরাধের নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি। তবে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪৯৭ ধারায় ব্যভিচার (adultery) সংক্রান্ত একটি বিধান রয়েছে। ওই ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কোনো বিবাহিত নারীর সঙ্গে তার স্বামীর সম্মতি ছাড়া অন্য পুরুষের যৌন সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার বিধান ছিল।
তবে এই ধারার ভাষা ও প্রয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আইনগত ও সামাজিক বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে নারী-পুরুষের সমতা, নারীর নিজস্ব সম্মতি ও আইনি অবস্থান এবং আধুনিক পারিবারিক কাঠামোর সঙ্গে পুরোনো আইনের সামঞ্জস্য নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।
পরকীয়া কেন হয়?
মানুষ কেন বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, তার একক কোনো কারণ নেই। ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন, মানসিক দূরত্ব, পারিবারিক সমস্যা, আবেগগত চাহিদা, সামাজিক পরিবেশসহ বিভিন্ন বিষয় এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে কোনো সম্পর্কের কারণ ব্যাখ্যা করা এবং সেটিকে আইনগতভাবে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা দুটি পৃথক বিষয়। একটি আচরণকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থাই মূল ভূমিকা পালন করে।
দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা নিয়ে বিতর্ক
দণ্ডবিধি, ১৮৬০ প্রণীত হওয়ার সময়কার সামাজিক বাস্তবতা বর্তমান সময়ের তুলনায় ভিন্ন ছিল। ফলে ব্যভিচার সংক্রান্ত বিধানটির কাঠামোতেও তৎকালীন সামাজিক ধারণার প্রতিফলন দেখা যায়।
এই বিধানের অন্যতম আলোচিত দিক হলো, এটি মূলত বিবাহিত নারীর সঙ্গে অন্য পুরুষের যৌন সম্পর্ককে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল। ফলে বিবাহিত পুরুষের অন্য নারীর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একইভাবে বিধানটি প্রযোজ্য হওয়ার প্রশ্নে সীমাবদ্ধতা ছিল।
এ ছাড়া ধারাটিতে সংশ্লিষ্ট নারীকে অপরাধের সহযোগী হিসেবে শাস্তি দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়নি। এ কারণে নারী-পুরুষের আইনি সমতা এবং আধুনিক সাংবিধানিক মূল্যবোধের সঙ্গে বিধানটির সামঞ্জস্য নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
আইন ও সমাজ নিয়ে আলোচনায় অনেকে মনে করেন, বর্তমান সময়ের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক সংক্রান্ত আইন পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে। তাদের মতে, নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য সমান আইনি কাঠামো থাকা উচিত এবং বিবাহিত সম্পর্কের বাইরে স্বেচ্ছায় সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে আইন কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
তবে এ ধরনের আইন সংস্কারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, পারিবারিক অধিকার, নারী-পুরুষের সমতা, সম্মতি এবং সন্তানের সর্বোত্তম স্বার্থের মতো বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
পরিবার ও সন্তানের ওপর প্রভাব
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের প্রভাব শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। এর ফলে দাম্পত্য সম্পর্কে সংকট, পারিবারিক বিরোধ এবং সন্তানের ওপর মানসিক ও সামাজিক চাপ তৈরি হতে পারে।
তাই এ ধরনের বিষয়ে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তি, কাউন্সেলিং এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
পরকীয়া বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে ঘিরে আইন কী হবে, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট, পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মতি, দায়িত্বশীলতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নির্দোষ কোনো ব্যক্তি বা সন্তান যেন পারিবারিক বিরোধের অনাকাঙ্ক্ষিত শিকার না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।


নিজস্ব প্রতিবেদক 


















