হিমেল আহাম্মেদ-
সম্পাদকীয় প্রতিবেদন:
গ্রাম হোক বা শহর—দেশজুড়ে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে কিশোর অপরাধ। কোথাও কয়েকজন কিশোর একসঙ্গে জড়ো হলেই এখন অনেকের মধ্যে অজানা আতঙ্ক কাজ করে। প্রতিবাদ করলেও উল্টো বিপাকে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
ফলে অনেকেই দেখেও না-দেখার ভান করছেন।
বাস্তবতা হলো, এসব কিশোরের বড় একটি অংশ মাদকাসক্ত এবং পারিবারিক অনুশাসন ও সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে দ্রুত অপরাধজগতে জড়িয়ে পড়ছে।
অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের কাছে অভিযোগ করেও প্রতিকার মিলছে না; বরং ভুক্তভোগীদেরই পড়তে হচ্ছে বিরূপ পরিস্থিতিতে।
অপহরণ, হত্যা, চাঁদাবাজি—প্রায় সব ধরনের অপরাধেই জড়িয়ে পড়ছে কিশোরদের একটি অংশ। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এদের বেপরোয়া চলাফেরা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, অপরাধে জড়ানো অনেক কিশোরের বয়স ১৩ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে।
বিদ্যমান শিশু আইনে বিচার হওয়ায় গুরুতর অপরাধেও তুলনামূলক কম শাস্তি পাচ্ছে তারা।
ফলে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে এক ধরনের ভয়হীনতা তৈরি হচ্ছে। এ বাস্তবতায় শিশুদের বয়সসীমা পুনর্নির্ধারণ বা আইন সংশোধনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে।
অভিযোগ রয়েছে, সন্ত্রাসী চক্রগুলো দারিদ্র্যপীড়িত ও ছিন্নমূল পরিবারের কিশোরদের টার্গেট করে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে দলে ভেড়ায়।
শুরুতে ছোটখাটো অপরাধে যুক্ত করলেও পরে মাদক ব্যবসা, অস্ত্র বহনসহ গুরুতর অপরাধে ব্যবহার করা হয়। একসময় এসব কিশোর অপরাধজগতের স্থায়ী সদস্যে পরিণত হয়।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, দ্রুত নগরায়ণ, পরিবার কাঠামোর পরিবর্তন, সামাজিক অবক্ষয় ও হতাশা—এসব কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপসংস্কৃতির প্রভাব, অল্প বয়সে অতিরিক্ত অর্থপ্রাপ্তি, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং অসৎ সঙ্গ।
বর্তমানে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
মাঝে মাঝে কিছু সদস্য গ্রেপ্তার হলেও তাতে পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হচ্ছে না।
সংশোধনাগারে পাঠানো ছাড়া কার্যকর শাস্তির অভাবও বড় একটি সমস্যা।
এ অবস্থায় কিশোর গ্যাং দমনে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। প্রয়োজন হলে আইন সংশোধন করতে হবে।
পাশাপাশি পাড়া-মহল্লাভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অভিভাবকদের সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়মিত বৈঠক করতে হবে, যাতে কিশোরদের সঠিক পথে পরিচালিত করা যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরিবার ও সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। সন্তানের আচরণ, চলাফেরা ও বন্ধুবান্ধব সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে অভিভাবকদের।
শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার সুযোগ বাড়াতে হবে।
সময় থাকতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই ‘কিশোর গ্যাং কালচার’ সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই এখনই সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।

