দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণ, খাদ্য মজুত পরিস্থিতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখার বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে নোয়াখালীর মাইজদী পৌর বাজারে ব্যবসায়ীদের মধ্যে লিফলেট বিতরণ করেছেন নোয়াখালী-৪ (সদর–সুবর্ণচর) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মোঃ শাহজাহান।
‎
‎বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর ২০২৬) আয়োজিত এ কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য মোঃ শাহজাহান। এ সময় নোয়াখালী জেলা বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
‎
‎কর্মসূচিতে বিতরণ করা লিফলেটে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, অতীতের বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা, সরকারি খাদ্য মজুত, বোরো মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদর নিয়ে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়।
‎
‎আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, জ্বালানি সংকটের পেছনের কারণ সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা, এ বিষয়ে ছড়িয়ে পড়া অপপ্রচারের জবাব দেওয়া এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করাই এ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য।
‎
‎বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে লিফলেটে যা বলা হয়েছে
‎
‎লিফলেটে দেশের বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকটের জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের পরিকল্পনা ও নীতিগত সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা হয়েছে। এতে দাবি করা হয়, বিগত দেড় দশকে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হলেও জ্বালানির প্রাপ্যতা, অর্থের সংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা বিবেচনায় পর্যাপ্ত পরিকল্পনা করা হয়নি।
‎
‎লিফলেটের বক্তব্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়লেও পর্যাপ্ত জ্বালানি ও অর্থের অভাবে সেই সক্ষমতার পুরোপুরি ব্যবহার সম্ভব হয়নি। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
‎
‎বিদ্যুৎ বিভাগের ১৪ অক্টোবর ২০২৬-এ হালনাগাদ করা তথ্য অনুযায়ী, দেশে ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ৩২ হাজার ৬৮৮ মেগাওয়াট। একই তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২০ মে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছিল ১৭ হাজার ২০১ মেগাওয়াট। তবে উৎপাদনক্ষমতা ও প্রকৃত উৎপাদন এক বিষয় নয়; জ্বালানির প্রাপ্যতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্ষমতা এবং সঞ্চালনব্যবস্থার ওপরও উৎপাদন ও সরবরাহ নির্ভর করে।
‎
‎এদিকে ২০২৬ সালের আগস্টে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, পর্যাপ্ত জ্বালানি ও সঞ্চালন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সংকট মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, ভোলার গ্যাস ব্যবহার, আমদানির মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও তিনি তুলে ধরেন।
‎
‎লিফলেটে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি ছিল বলে সমালোচনা করা হয়েছে। তবে এটি প্রচারপত্রে উত্থাপিত রাজনৈতিক বক্তব্য; এ দাবির পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন যাচাই এই প্রতিবেদনে করা হয়নি।
‎
‎সরকারি খাদ্য মজুত ও খাদ্য নিরাপত্তা
‎
‎কর্মসূচিতে বিতরণ করা লিফলেটে খাদ্য মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে দাবি করা হয়, সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্যের মজুত থাকলে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, মূল্যবৃদ্ধির চাপ মোকাবিলা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হয়।
‎
‎খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে সরকারি খাদ্যশস্যের মোট মজুত ছিল ২৩ লাখ ৫৯ হাজার ১৫৪ মেট্রিক টন। এর মধ্যে চাল, গম ও ধান অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, খাদ্য মজুতের পরিমাণ আগের ছয় মাসে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪৮৪ মেট্রিক টন বেড়েছে।
‎
‎এ ছাড়া ২০২৬ সালের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত সরকারি গুদামে ২৪ লাখ ৩৭ হাজার ৮০৭ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য মজুত থাকার তথ্য খাদ্যমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছিলেন বলে ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি) ৩ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে।
‎
‎এই তথ্যগুলো খাদ্য মজুতের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে। তবে সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের মজুত থাকা এবং খুচরা বাজারে পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকা এক বিষয় নয়। বাজারদর নির্ভর করে উৎপাদন, পরিবহন ব্যয়, আমদানি, সরবরাহব্যবস্থা, চাহিদা এবং বাজার তদারকিসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।
‎
‎বোরো মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা
‎
‎লিফলেটে চলতি বোরো মৌসুমে সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
‎
‎প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বোরো সংগ্রহ মৌসুমে সরকার ৫ লাখ মেট্রিক টন ধান, ১২ লাখ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল এবং ১ লাখ মেট্রিক টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। এ সংগ্রহ কার্যক্রম ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চালানোর কথা জানানো হয়েছিল।
‎
‎দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ধান ও চাল সংগ্রহের মাধ্যমে সরকারি খাদ্য মজুত বাড়ানো, খাদ্য বিতরণ কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বাজার পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি বজায় রাখা এ ধরনের কার্যক্রমের অন্যতম উদ্দেশ্য।
‎
‎তবে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রকৃত সংগ্রহ সম্পন্ন হওয়া আলাদা বিষয়। তাই সংগ্রহ কার্যক্রমের সাফল্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার পাশাপাশি বাস্তবে কতটুকু খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা হয়েছে, সেই তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ।
‎
‎নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সচেতনতা
‎
‎মাইজদী পৌর বাজারে ব্যবসায়ীদের মধ্যে লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদর ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
‎
‎আয়োজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং বাজার নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করা এ কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা, সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
‎
‎জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়; পরিবহন, কৃষি উৎপাদন, পণ্য পরিবহন ব্যয় এবং শিল্পকারখানার কার্যক্রমের মাধ্যমেও এর প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে পড়তে পারে। অন্যদিকে খাদ্যশস্যের পর্যাপ্ত মজুত বাজারে সরবরাহ বজায় রাখতে সহায়তা করলেও নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে কার্যকর বাজার তদারকি ও সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্ব রয়েছে।
‎
‎জনসচেতনতা ও জবাবদিহিতার ওপর গুরুত্ব
‎
‎নোয়াখালী সদর উপজেলার মাইজদী পৌর বাজারে অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচির মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, সরকারি খাদ্য মজুত এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে জনগণকে অবহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
‎
‎অতীতের বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনা ও সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক সমালোচনার পাশাপাশি বর্তমান খাদ্য মজুত ও সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রমের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
‎
‎