সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে স্কেল প্রণয়ন নিয়ে আলোচনা এবং গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির উদ্যোগের মধ্যে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের জন্যও যুক্তিসংগত বেতন কাঠামো চালুর দাবি উঠেছে। মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্রমবর্ধমান দামের চাপে থাকা বেসরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে এ খাতে বেতন নির্ধারণের সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের অবদান উল্লেখযোগ্য। ব্যাংক, বীমা, তৈরি পোশাক, ওষুধ, টেক্সটাইল, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও এনজিওসহ বিভিন্ন খাতে লাখ লাখ মানুষ কর্মরত। অর্থনীতির গতিশীলতা বজায় রাখতে তাঁদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে বেতন নির্ধারণ, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে অভিন্ন কোনো কাঠামো নেই।
সরকারি চাকরিতে নির্ধারিত বেতন গ্রেড, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ও পদোন্নতির নীতিমালা থাকলেও বেসরকারি খাতের অনেক প্রতিষ্ঠানে এসব বিষয় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। ফলে একই পদে ও সমান অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বেতনের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। কোথাও কোথাও দীর্ঘদিন বেতন না বাড়ার অভিযোগও রয়েছে।
অন্যদিকে বাড়িভাড়া, খাদ্যপণ্য, যাতায়াত, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। এতে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠছে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে স্কেলের সম্ভাবনা এবং গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির উদ্যোগ আলোচনায় থাকলেও বেসরকারি খাতের বিপুলসংখ্যক চাকরিজীবীর বেতন ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতের জন্য একটি যুক্তিসংগত ও নমনীয় বেতন কাঠামো প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে সব প্রতিষ্ঠানের জন্য একই বেতন নির্ধারণ না করে প্রতিষ্ঠানের আকার, আর্থিক সক্ষমতা ও শিল্পখাতের ধরন বিবেচনায় নেওয়ার প্রস্তাব করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত কাঠামোতে পদ ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক বেতন গ্রেড নির্ধারণ, নিয়মিত বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের নীতিমালা, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন পুনর্মূল্যায়ন এবং ভাতা, বোনাস ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার স্বচ্ছ হিসাব নিশ্চিত করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বেতন কাঠামো স্বচ্ছ ও পূর্বনির্ধারিত হলে কর্মীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে দক্ষ কর্মী ধরে রাখা, কর্মী পরিবর্তনের হার কমানো এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কর্মীদের কল্যাণে বিনিয়োগকে প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিবেচনা করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে এ ধরনের কাঠামো বাস্তবায়নে এককভাবে কোনো পক্ষের সিদ্ধান্তের পরিবর্তে সরকার, মালিকপক্ষ, শ্রমিক-কর্মচারী প্রতিনিধি ও মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা জরুরি। কোন খাতে কী ধরনের বেতন কাঠামো কার্যকর করা সম্ভব এবং কীভাবে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।
প্রাথমিকভাবে বড় ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের নীতিমালা চালুর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট খাতের সক্ষমতা ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে তা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
অর্থনীতির প্রতিটি খাতের কর্মজীবী মানুষই দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছেন। তাই সরকারি চাকরিজীবী ও গার্মেন্টস শ্রমিকদের পাশাপাশি বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন, সুযোগ-সুবিধা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। সময়োপযোগী বেতন কাঠামো প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ বৈষম্য কমাতে এবং কর্মক্ষেত্রে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারে।