গভীর রাতে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়া শুধু একটি নাগরিক সেবা ব্যাহত হওয়ার ঘটনা নয়; অনেকের জন্য এটি হয়ে ওঠে চরম দুর্ভোগের কারণ। বিশেষ করে গরমের সময়ে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে শিশু, বয়স্ক, অসুস্থ ব্যক্তি ও শ্রমজীবী মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।
বর্তমানে শহরাঞ্চল থেকে শুরু করে মফস্বল পর্যন্ত অধিকাংশ বাড়িঘর পাকা বা ইটের তৈরি। দিনের প্রচণ্ড গরমে এসব ভবনের দেয়াল ও ছাদ উত্তপ্ত হয়ে থাকে। রাতেও সেই তাপ ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বিদ্যুৎ না থাকলে ফ্যান বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ছাড়া স্বাভাবিকভাবে ঘুমানো কঠিন হয়ে পড়ে।
সারাদিন কঠোর পরিশ্রমের পর একজন শ্রমজীবী মানুষ রাতে একটু স্বস্তির ঘুমের প্রত্যাশা করেন। কিন্তু গভীর রাতে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে সেই বিশ্রামও ব্যাহত হয়। ঘুমের এই বিঘ্ন শুধু সাময়িক অস্বস্তিই নয়, নিয়মিত হলে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
শিশু ও অসুস্থদের দুর্ভোগ বেশি
পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম শিশুদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা, শেখার সক্ষমতা এবং দৈনন্দিন কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে রাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলে পরদিন স্কুলগামী শিশুদের ক্লান্তি ও মনোযোগের সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
অন্যদিকে হাসপাতাল ও বাসাবাড়িতে চিকিৎসাধীন রোগীদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকলে অসুস্থ ব্যক্তি, বয়স্ক মানুষ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের শারীরিক অস্বস্তি বেড়ে যেতে পারে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে সেখানে থাকা রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগও বহুগুণ বাড়ে।
বিদ্যুৎ সরবরাহে জবাবদিহি প্রয়োজন
জনসাধারণ নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেন। তাই নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কোনো এলাকায় রক্ষণাবেক্ষণ বা অন্য কোনো কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হলে, সম্ভব হলে আগেই গ্রাহকদের জানানো এবং জরুরি সেবা ও হাসপাতালগুলোর বিদ্যুৎ সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ বিভ্রাট যদি নিয়মিত ও দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এর কারণ, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি বা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ থাকলে সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
সংকটের অজুহাতে অব্যবস্থাপনা নয়
দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে নানা ধরনের সংকট থাকতে পারে। তবে সংকটের সময়েই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার প্রয়োজন আরও বেশি। বিদ্যুৎ খাতসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তার যথাযথ তদন্ত হওয়া দরকার।
নাগরিকদের মৌলিক সেবার মান উন্নত করতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না, সেবার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু পরিসংখ্যান বা বড় বড় প্রকল্পের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না; সাধারণ মানুষ প্রতিদিন কতটা নিরাপদ, স্বস্তিপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারছেন, সেটিও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
গভীর রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে একজন শ্রমিকের ঘুম নষ্ট হয়, একজন শিশুর বিশ্রাম ব্যাহত হয়, একজন রোগীর কষ্ট বাড়ে। এসব মানুষের দুর্ভোগকে কেবল ‘লোডশেডিং’ বা ‘সাময়িক বিদ্যুৎ বিভ্রাট’ হিসেবে দেখলে সমস্যার মানবিক দিকটি আড়াল হয়ে যায়।
তাই বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, গ্রাহকদের তথ্য জানানো এবং অভিযোগের দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে দায়িত্বে অবহেলা বা অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
বিদ্যুৎ মানুষের বিলাসিতা নয়, আধুনিক জীবনের অপরিহার্য সেবা। তাই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে মানুষের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা যাতে অযথা ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা প্রয়োজন।