নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি ব্রিজের কাজে অনিয়ম ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

ব্রিজের ফুটপাতের স্ল্যাবে প্রয়োজনীয় পরিমাণ রড ব্যবহার না করে কোথাও কোথাও রডের পরিবর্তে চিকন তার ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এতে পথচারীদের চলাচলের সময় স্ল্যাব ভেঙে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

এ ছাড়া ব্রিজের ফুটপাতের স্ল্যাব ও রেলিং নির্মাণে নিম্নমানের ও মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। নির্মাণকাজের অনিয়মের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

এ ঘটনায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বেগমগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী আবুল মনসুর আহমেদ ও উপসহকারী প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলামকে কৈফিয়ত তলব করা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ত্রুটিপূর্ণ কাজ সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছে এলজিইডি।

৪৯ মিটার দীর্ঘ ব্রিজ
এলজিইডি নোয়াখালীর তথ্য অনুযায়ী, বেগমগঞ্জ উপজেলার জমিদারহাট থেকে সাহেবের হাট ও হাসানহাট হয়ে মাইজদী আঞ্চলিক মহাসড়কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য ৪৯ দশমিক ০৬ মিটার দীর্ঘ আরসিসি ব্রিজটির নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর।

মেসার্স হক ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান ব্রিজটির নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায়। তবে ৫ আগস্টের পর মো. ফরহাদ নামে এক ব্যক্তি কাজটি পরিচালনা করছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

রাতের আঁধারে নিম্নমানের কাজের অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্মাণকাজ শুরুর পর থেকেই ব্রিজটিতে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম তাদের নজরে আসে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হলে কিছু কাজ সংশোধনও করা হয়।

তবে স্থানীয়দের দাবি, নির্মাণকাজের শেষ পর্যায়ে রাতের আঁধারে ব্রিজের ফুটপাতের স্ল্যাবে রডের পরিবর্তে জিও তার ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে রেলিং নির্মাণেও নিম্নমানের ও মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

তাদের অভিযোগ, ফুটপাতের স্ল্যাবে পথচারীরা পা দেওয়ার পরই কোথাও কোথাও স্ল্যাব ভেঙে পড়ে। রেলিংয়ের কিছু অংশেও হাত দিলে বা চাপ পড়লে নির্মাণসামগ্রী ভেঙে পড়ছে বলে তারা জানান।
পরে স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি এলজিইডিকে জানালে গত ২১ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

নকশা ও স্পেসিফিকেশনবহির্ভূত কাজ শনাক্ত
এলজিইডি নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী যুগল কৃষ্ণ মন্ডল জানান, এলজিইডির সুপারিনটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার, ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের প্রতিনিধিদের নিয়ে নির্মাণকাজ সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়।
পরিদর্শনে ব্রিজের ফুটপাতের স্ল্যাবের কাজ নিম্নমানের এবং নকশা ও স্পেসিফিকেশনবহির্ভূত বলে প্রতীয়মান হয়েছে। একই সঙ্গে রেলিংয়ের রডের কাজও নিম্নমানের বলে দেখা গেছে।

দুই প্রকৌশলীকে কৈফিয়ত তলব
এ ঘটনায় বেগমগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী আবুল মনসুর আহমেদ ও উপসহকারী প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলামকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে অবহেলার বিষয়ে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না দিলে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হবে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হক ট্রেডার্সকে নকশা ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী নির্মাণকাজের ত্রুটিগুলো সংশোধন করে সাত দিনের মধ্যে লিখিতভাবে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নকশা ও স্পেসিফিকেশনবহির্ভূত কোনো কাজের বিল পরিশোধ করা হবে না বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মেসার্স হক ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ফজলুল হক বলেন, কাজটি তার প্রতিষ্ঠান পেলেও বর্তমানে মো. ফরহাদ নামের একজন ব্যক্তি কাজটি করছেন। ৫ আগস্টের পর তিনি তার কাছ থেকে কাজটি নিয়ে নিয়েছেন বলে জানান তিনি।

মো. ফরহাদ ব্রিজের ফুটপাতের স্ল্যাব ও রেলিংয়ের কাজে কিছু ত্রুটি হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, এলজিইডির প্রকৌশলীদের উপস্থিতিতে যেসব অংশের কাজ ভালো হয়নি, সেসব অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী সেগুলো নতুন করে নির্মাণ করে দেওয়া হবে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আশপাশের চার ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ জেলা শহরে যাতায়াতের জন্য ব্রিজটি ব্যবহার করবেন। তাই নির্মাণকাজে কোনো ধরনের অনিয়ম বা নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হলে ভবিষ্যতে এটি জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তাদের দাবি, সরকারি অর্থের অপচয় রোধে নির্মাণকাজের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি নকশা ও নির্ধারিত মান অনুযায়ী দ্রুত ব্রিজটির নির্মাণকাজ শেষ করতে হবে।