“প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি, বাস্তবতায় প্রশ্ন চাঁদাবাজি, অবৈধ বালু পরিবহন, ডেঙ্গু, চুরি-ডাকাতি ও জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষ”
নির্বাচনের সময় মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। বলা হয় নির্বাচিত হলে চাঁদাবাজি বন্ধ করা হবে, অবৈধ বালুবাহী ট্রাক চলাচল বন্ধ করা হবে, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে, সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা হবে। জনগণ শান্তি, নিরাপত্তা ও নির্ভয়ে বসবাসের পরিবেশ পাবে।
এমনকি অনেক সময় বলা হয়, নির্বাচনী এলাকাকে আধুনিক ও উন্নত নগরীর আদলে সাজিয়ে তোলা হবে কেউ কেউ ‘সিঙ্গাপুরের মতো’ উন্নত এলাকার স্বপ্নও দেখান।
কিন্তু প্রশ্ন হলো নির্বাচনের পর সেই প্রতিশ্রুতির কতটুকু বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে?
নোয়াখালী-৫ আসন কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাট উপজেলা এবং নোয়াখালী সদর উপজেলার অশ্বদিয়া ও নেয়াজপুর ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এই বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের প্রত্যাশাও কম নয়। উন্নয়ন, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগব্যবস্থা ও নাগরিক সুবিধার পাশাপাশি মানুষ চায় একটি শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশ।
কিন্তু স্থানীয় মানুষের নানা অভিযোগ ও আলোচনায় উঠে আসছে ভিন্ন চিত্র। চাঁদাবাজি, অবৈধ বালু পরিবহন, চুরি-ডাকাতি, সন্ত্রাস এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির মতো বিষয়গুলো নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা কতটা দৃশ্যমান,সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বিশেষ করে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগ রয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মানুষ অসুস্থ হচ্ছে, কেউ কেউ মৃত্যুবরণও করছে,এমন পরিস্থিতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জনসচেতনতা এবং দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করেন সাধারণ মানুষ।
অন্যদিকে, চুরি-ডাকাতি ও অপরাধের অভিযোগ বাড়তে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা সক্রিয়? নির্বাচনের আগে ‘সন্ত্রাসমুক্ত এলাকা’ গড়ার প্রতিশ্রুতি থাকলে নির্বাচনের পর সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ কোথায়?
আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো অবৈধ বালু পরিবহন ও বালুবাহী ট্রাক। যদি কোথাও নিয়মবহির্ভূতভাবে বালু উত্তোলন বা পরিবহন হয়ে থাকে, তাহলে তা বন্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ এর সঙ্গে শুধু পরিবেশের বিষয় নয়, সড়কের নিরাপত্তা, জনদুর্ভোগ এবং স্থানীয় অর্থনীতির বিষয়ও জড়িত।
প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা:
জনগণের প্রশ্ন খুবই সহজ নির্বাচনের সময় যদি বলা হয়, ‘আমি নির্বাচিত হলে চাঁদাবাজি বন্ধ করব’, তাহলে নির্বাচনের পর চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না কেন?
যদি বলা হয়, ‘এলাকাকে সন্ত্রাসমুক্ত করব’, তাহলে সাধারণ মানুষ কেন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে?
যদি বলা হয়, ‘স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করব’, তাহলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় আরও দৃশ্যমান উদ্যোগ থাকবে না কেন?
আর যদি বলা হয়, ‘নির্বাচনী এলাকাকে সিঙ্গাপুরের মতো করে সাজাব’, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে,সিঙ্গাপুরের মতো পরিকল্পিত, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ এলাকা গড়ার আগে ন্যূনতম নাগরিক নিরাপত্তা ও মৌলিক সেবাগুলো কি নিশ্চিত করা হয়েছে?
সিঙ্গাপুরের স্বপ্ন, নাকি ক্যামেরুনের বাস্তবতা?
‘সিঙ্গাপুরের মতো’ এলাকা গড়ার স্বপ্ন অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু উন্নয়ন শুধু বড় বড় প্রকল্প, রাস্তা বা ভবন নির্মাণের নাম নয়। উন্নয়ন মানে নাগরিকের নিরাপত্তা, আইনের শাসন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন এবং সাধারণ মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা।
তাই নোয়াখালী-৫ আসনের মানুষের প্রশ্ন এখন তারা কি সত্যিই সিঙ্গাপুরের মতো একটি উন্নত, নিরাপদ ও আধুনিক নির্বাচনী এলাকা দেখতে যাচ্ছে, নাকি প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার ফারাক আরও বাড়তে থাকবে?
জনগণ এখন আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না। তারা চায় দৃশ্যমান কার্যকর ব্যবস্থা। চায় চাঁদাবাজি ও অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ, অবৈধ বালু পরিবহন বন্ধে অভিযান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর কর্মসূচি, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপদে বসবাসের নিশ্চয়তা।
নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতির মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত জনগণই করবে। তাই জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই “স্লোগান নয়, প্রতিশ্রুতি নয়; এখন প্রয়োজন বাস্তব কাজ”।
নোয়াখালী-৫ আসনকে সিঙ্গাপুরের মতো করার স্বপ্ন যদি সত্যিই থাকে, তাহলে তার প্রথম শর্ত হওয়া উচিত জনগণের নিরাপত্তা, সুশাসন ও মৌলিক নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা।