ধর্ষণের  খবর এখন আর সমাজকে কাঁপিয়ে দেয় না—বরং অনেক সময় নতুন আরেকটি ঘটনার কাছে পুরোনো ঘটনাটি চাপা পড়ে যায়। কয়েক দিন আলোচনা, কিছু প্রতিবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ, কঠোর শাস্তির দাবি;তারপর আবার নীরবতা। এই নীরবতার মধ্যেই অপরাধের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু ধর্ষকের শাস্তি চাই, নাকি ধর্ষণমুক্ত সমাজ চাই?

দুটির মধ্যে পার্থক্য আছে। শাস্তি অপরাধের পরের ব্যবস্থা; প্রতিরোধ অপরাধের আগের লড়াই। একটি সভ্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধীকে কারাগারে পাঠানো নয়, এমন সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা;যেখানে অপরাধ করার সাহস, সুযোগ ও মানসিকতা—তিনটিই কমে আসে।

ধর্ষণের জন্য কোনো একক কারণকে দায়ী করা যায় না। নারীর পোশাক, চলাফেরা, রাতের সময় বাইরে থাকা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দায়ী করা যেমন অযৌক্তিক, তেমনি শুধু মাদক, পর্নোগ্রাফি বা বেকারত্বকে দায়ী করাও বাস্তবতার সরলীকরণ। যৌন সহিংসতার পেছনে ব্যক্তির আচরণ, পারিবারিক পরিবেশ, ক্ষমতার অপব্যবহার, নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি, সহিংসতার সংস্কৃতি, সামাজিক নীরবতা এবং বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা;বিভিন্ন কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা আমাদের মানসিকতায়। আমরা অনেক সময় অপরাধীর চেয়ে ভুক্তভোগীকেই বেশি প্রশ্ন করি। সে কোথায় গিয়েছিল, কী পরেছিল, কার সঙ্গে ছিল—এসব প্রশ্নের আড়ালে অপরাধীর দায় যেন ধীরে ধীরে আড়াল হয়ে যায়। অথচ সত্যটি খুব সরল—কোনো পোশাক, কোনো সময়, কোনো স্থান এবং কোনো সামাজিক পরিচয় একজন মানুষকে অন্যের ওপর যৌন সহিংসতা চালানোর অধিকার দেয় না।

পরিবার থেকেই পরিবর্তনের শুরু হতে হবে। সন্তানকে শুধু ভালো ফলাফল করার শিক্ষা দিয়ে ভালো মানুষ বানানো যায় না। তাকে শেখাতে হবে সম্মান, আত্মসংযম, সহমর্মিতা, ব্যক্তিগত সীমারেখা ও সম্মতির মূল্য। ছেলে শিশুকে যেমন শেখাতে হবে নারীর প্রতি সম্মান, তেমনি মেয়েশিশুকে শেখাতে হবে নিজের নিরাপত্তা, অধিকার ও বিপদের সময় সাহায্য চাওয়ার পথ।

শিক্ষাব্যবস্থাকেও বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। বয়সোপযোগী শরীর, নিরাপত্তা, সম্মতি, যৌন হয়রানি ও অনলাইন ঝুঁকি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক শিক্ষা কোনো অশ্লীলতা নয়; এটি সুরক্ষার শিক্ষা। প্রযুক্তির যুগে সন্তানকে মোবাইল দিয়ে নজরদারি না করে ডিজিটাল সচেতনতা শেখানোও অভিভাবকের দায়িত্ব।

তবে সবচেয়ে জরুরি হলো;আইনের কার্যকর প্রয়োগ। শুধু কঠোর শাস্তির আইন থাকলেই অপরাধ কমে না; অপরাধীর মনে ধরা পড়া ও বিচারের মুখোমুখি হওয়ার বাস্তব ভয় তৈরি করতে হয়। অভিযোগ গ্রহণ থেকে তদন্ত, মেডিকেল পরীক্ষা, ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ এবং বিচার—প্রতিটি ধাপ দ্রুত, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে। প্রভাবশালী অপরাধীর জন্য এক আইন আর সাধারণ মানুষের জন্য আরেক আইন—এমন ধারণা তৈরি হলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়।

একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। তার পরিচয় প্রকাশ, ছবি ছড়িয়ে দেওয়া, চরিত্রহনন কিংবা সামাজিকভাবে হেয় করা—এসবও এক ধরনের দ্বিতীয় দফা নির্যাতন। অপরাধীর বিচার হবে আইনের মাধ্যমে; ভুক্তভোগীর সামাজিক বিচার করার অধিকার কারও নেই।

আমাদের আরও একটি ‘ঘোড়ামি’ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে—জটিল সমস্যার সহজ, আবেগনির্ভর ও লোকদেখানো সমাধান খোঁজার প্রবণতা। প্রতিটি ঘটনার পর শুধু ‘ফাঁসি চাই’ বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ফাঁসির দাবি যত সহজ, অপরাধের সামাজিক শিকড় চিহ্নিত করে তা উপড়ে ফেলা তত কঠিন। কিন্তু স্থায়ী সমাধান সেই কঠিন কাজেই।

রাষ্ট্রকে তাই অপরাধের পর প্রতিক্রিয়াশীল নয়, প্রতিরোধমূলক হতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন, কর্মক্ষেত্র, আবাসিক এলাকা ও অনলাইন জগতে নিরাপত্তা কাঠামো জোরদার করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ শনাক্ত করে আগাম ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে অপরাধের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রমাণভিত্তিক নীতি তৈরি করতে হবে।

ধর্ষণ প্রতিরোধ শুধু নারীর নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি পুরুষের চরিত্র, পরিবারের শিক্ষা, সমাজের বিবেক এবং রাষ্ট্রের সক্ষমতার পরীক্ষা। যে সমাজ নারীর স্বাধীনতাকে সন্দেহ করে কিন্তু অপরাধীর ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে না, সে সমাজ নিরাপদ হতে পারে না।

আমাদের বুঝতে হবে—ধর্ষক জন্মগতভাবে ধর্ষক হয়ে জন্মায় না; সমাজ, পরিবেশ, মূল্যবোধ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও নানা ঝুঁকির সমন্বয়ে অনেক সময় অপরাধী মানসিকতা তৈরি হয়। তাই অপরাধীর শাস্তির পাশাপাশি সেই পরিবেশকেও বদলাতে হবে।

আজ প্রয়োজন শুধু ক্ষোভ নয়, আত্মসমালোচনা। শুধু শাস্তির দাবি নয়, প্রতিরোধের পরিকল্পনা। শুধু রাষ্ট্রকে প্রশ্ন নয়, পরিবার ও সমাজকেও প্রশ্ন করা।

কারণ ধর্ষণ বন্ধের লড়াই থানায় মামলা হওয়ার পর শুরু হওয়া উচিত নয়; শুরু হওয়া উচিত শিশুর প্রথম শিক্ষা থেকেই।

একটি নিরাপদ সমাজ গড়তে হলে ধর্ষকের হাত থামানোর পাশাপাশি ধর্ষক তৈরি হওয়ার পথও বন্ধ করতে হবে। এ দায়িত্ব পরিবার, শিক্ষা, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার।