নোয়াখালীতে হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের বিভিন্ন উন্নয়ন ও ধর্মীয় কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তালিকায় নাম থাকার পরও কয়েকজন উপকারভোগীর ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা না হওয়া, মন্দিরের নামে বরাদ্দ পাওয়া অর্থ উত্তোলন করতে না পারা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত এ প্রতিষ্ঠানটি মন্দির উন্নয়ন, ধর্মীয় শিক্ষা, অসচ্ছল ব্যক্তিদের সহায়তা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে থাকে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নোয়াখালীতে ট্রাস্টের বিভিন্ন বরাদ্দ ও প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ট্রাস্টের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

ব্যাংক হিসাবে টাকা না পাওয়ার অভিযোগ-

বেগমগঞ্জের কৃষক শিমুল চন্দ্র অভিযোগ করেন, ওয়ান ব্যাংকের তার হিসাব নম্বর ০৩৮২০৫০০৮৭৩৯৮-এ তার নামে টাকা বরাদ্দ দেখানো হলেও তিনি সেই অর্থ পাননি।

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন মরণ চন্দ্র নামে এক শিক্ষার্থী। তার দাবি, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের হিসাব নম্বর ৯৯০২১০০৪০০৯০৬-এর বিপরীতে বরাদ্দ দেখানো হলেও তিনি কোনো টাকা পাননি।

বেগমগঞ্জের পরেশ চন্দ্র মজুমদার জানান, তাদের শ্রী শ্রী রক্ষা কালী মন্দিরের হিসাব নম্বর ২৫০১০১০০০৭৬৬৩-এর বিপরীতে হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের বরাদ্দ থাকলেও এখন পর্যন্ত তারা ওই অর্থ উত্তোলন করতে পারেননি।

সদরের প্রদীপ চন্দ্র বলেন, তালিকায় তার নাম থাকলেও রূপালী ব্যাংকের হিসাব নম্বর ২৫০১০১০০১০৯২৬-এ কোনো অর্থ জমা হয়নি।

কোম্পানীগঞ্জের শুক্লা দাস, সোনাইমুড়ীর আমিশাপাড়ার রিনা দাস, হাতিয়ার আফাজিয়ার সুমন দাস, কবিরহাটের বিধান ভৌমিক এবং বাটইয়া কালী মন্দিরের প্রতিনিধিরাও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। সেনবাগের স্বর্ণা রানী দাস ও সুবর্ণচরের চরভাটার একা মজুমদারের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগের কথা তুলে ধরেছেন অভিযোগকারীরা।

কমিশন ও প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ-

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বড় মন্দিরগুলোর উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে কমিশন নেওয়া এবং পছন্দের ব্যক্তিদের মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়নের নামে অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে।

কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এসকে তুরুন দে অভিযোগ করেন, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের নাম ব্যবহার করে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তার দাবি, এ বিষয়ে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা প্রয়োজন।

কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক তপন কুমার বসু মিন্টুও ট্রাস্টের কার্যক্রমে অনিয়ম এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করেন। তিনি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

অভিযোগকারীরা ট্রাস্টের বিরুদ্ধে মোট ১২ দফা অভিযোগের কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার, সরকারি অর্থের অনিয়ম, একই মন্দিরে একাধিকবার অনুদান দেওয়ার অভিযোগ এবং কমিশন গ্রহণের অভিযোগ।

রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ-

বিএনপি নেতা শ্যামল বরণ মজুমদারের অভিযোগ, নোয়াখালীর ট্রাস্ট অফিসে এখনো আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রভাব রয়েছে এবং বিএনপিপন্থী হিন্দু নেতাকর্মীদের সঙ্গে যথাযথ সমন্বয় করা হচ্ছে না।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক শ্যামল দাস বলেন, গত প্রায় দুই বছরে বিএনপিপন্থী হিন্দুদের প্রত্যাশিত সহযোগিতা দেওয়া হয়নি। বরং ট্রাস্টের নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

যুবদল নেতা রাজীব চৌধুরীও ট্রাস্টের বিভিন্ন কার্যক্রমে অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ তুলে তদন্তের দাবি জানান।

ছাত্রদলের সদস্য নিলয় দাস অভিযোগ করেন, মাইজদীস্থ ট্রাস্ট অফিসের কিছু কর্মকর্তা নিয়মিত অফিস কার্যক্রম পরিচালনার পরিবর্তে মন্দিরভিত্তিক উন্নয়ন ও অসচ্ছল ব্যক্তিদের সহায়তার ফরম নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। এর মাধ্যমে আর্থিক অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তপন চন্দ্র মজুমদার বলেন, অসচ্ছল ব্যক্তিদের সহায়তা, শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি এবং মন্দির উন্নয়নের বরাদ্দে স্বজনপ্রীতি বা অনিয়ম হয়ে থাকলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

ট্রাস্টের সচিব দেবেন্দ্রনাথ জানান, গত অর্থবছরে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও বৃত্তি বাবদ প্রায় দুই লাখ টাকা, অসচ্ছল ব্যক্তিদের ভাতা হিসেবে এক লাখ ১৮ হাজার টাকা, মন্দির উন্নয়নে তিন লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং পুরোহিতদের জন্য দুই লাখ ১০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বৃহত্তর নোয়াখালীতে এসব অর্থ কেউ আত্মসাৎ বা নয়ছয় করে থাকলে তা দুঃখজনক। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে অভিযোগের বিষয়ে তথ্য অধিকার আইনে নির্ধারিত ফরমে নোয়াখালীর পূর্ণাঙ্গ তালিকা চাওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সব তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

নোয়াখালীর ট্রাস্টি পার্থ পাল বলেন, ট্রাস্টের বরাদ্দকৃত টাকা নয়ছয় করার সুযোগ নেই। কোনো উপকারভোগীর ব্যাংক হিসাবে টাকা না গিয়ে থাকলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ট্রাস্টের উপ-পরিচালক প্রশান্ত কুমার বিশ্বাস বলেন, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব, বরাদ্দের তালিকা, প্রকল্পের নথি ও অর্থ ছাড়ের তথ্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।