নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এক যুবকের মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্কও বেড়েছে। তবে এ পরিস্থিতিতে শুধু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা নয়, ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, স্বাস্থ্য বিভাগ, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ডেঙ্গু মশাবাহিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা যেমন জরুরি, তেমনি রোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, লার্ভা শনাক্তকরণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো।

এসব কার্যক্রমে ঘাটতি থাকলে শুধু হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসা দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব কি শুধু চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ?
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।

ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীর তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি, আক্রান্তের এলাকা চিহ্নিতকরণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লে দ্রুত জানা প্রয়োজন, রোগীরা কোন কোন এলাকা থেকে আসছেন, কোথায় আক্রান্তের ঘনত্ব বেশি এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় মশার প্রজননস্থলের অবস্থা কী।

এসব তথ্য নিয়মিতভাবে জনসম্মুখে প্রকাশ করা হলে জনগণও স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতেন।

বসুরহাট পৌরসভার ভূমিকা কতটা কার্যকর?কোম্পানীগঞ্জের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বসুরহাট পৌরসভার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ড্রেন, জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন, আবর্জনা ও অপরিচ্ছন্ন স্থান এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বসুরহাট পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর খবর পাওয়া যায়। এ সময় বাসস্ট্যান্ড, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন বাসাবাড়ির আশপাশ ও ড্রেন পরিষ্কার করার পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

তবে প্রশ্ন হলো, এ ধরনের অভিযান কতটা নিয়মিত? নাকি ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার পরই কেবল দৃশ্যমান কর্মসূচি নেওয়া হয়?

একদিনের পরিচ্ছন্নতা অভিযান দিয়ে এডিস মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

প্রয়োজন ওয়ার্ডভিত্তিক নিয়মিত পরিদর্শন, লার্ভা শনাক্তকরণ, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ এবং দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ।

ইউনিয়ন পর্যায়েও নজরদারি প্রয়োজন-
কোম্পানীগঞ্জ শুধু বসুরহাট পৌরসভা নিয়ে গঠিত নয়। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বিপুলসংখ্যক মানুষ বসবাস করেন। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে ইউনিয়ন পরিষদ, স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।

কোনো ইউনিয়নে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লে বাড়ি বাড়ি সচেতনতা, সম্ভাব্য মশার প্রজননস্থল শনাক্তকরণ এবং স্থানীয়ভাবে পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করা হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

শুধু শহরকেন্দ্রিক কার্যক্রম দিয়ে পুরো উপজেলার ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। গ্রাম, বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও জনসমাগমস্থলেও সমানভাবে নজরদারি প্রয়োজন।
প্রশাসনের সমন্বয় ও জবাবদিহি কোথায়?

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয় ছাড়া স্বাস্থ্য বিভাগ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম অনেক সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।

তাই উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একটি সমন্বিত ডেঙ্গু প্রতিরোধ পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। কোন এলাকায় কতজন আক্রান্ত, কোথায় মশার প্রজননস্থল পাওয়া গেছে, কোন এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান হয়েছে এবং কোথায় পুনরায় অভিযান প্রয়োজন, এসব তথ্যের ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি।

রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও দায়িত্ব রয়েছে-
ডেঙ্গু কোনো দলীয় সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের বিষয়। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা শুধু বক্তব্য বা কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না রেখে জনসম্পৃক্ত কার্যক্রমে কাজে লাগানো যেতে পারে।

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা ওয়ার্ড ও ইউনিয়নভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পারেন। বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, সামাজিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে সমন্বয় করে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করা সম্ভব।

দায় কি শুধু প্রশাসনের?
ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রশাসনের পাশাপাশি নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। বাসাবাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, ড্রাম, বালতি কিংবা অন্য কোনো পাত্রে জমে থাকা পানিতেও এডিস মশার প্রজনন হতে পারে।

তাই নিজেদের বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং পানি জমতে না দেওয়ার দায়িত্ব নাগরিকদেরও রয়েছে।

তবে নাগরিকের দায়িত্ব আছে বলেই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং জনসচেতনতা, জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগ এবং সরকারি ব্যবস্থাপনার সমন্বিত কার্যক্রমই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রতিরোধের আগে কেন সতর্কতা নয়?

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কোম্পানীগঞ্জে ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার খবর পাওয়া গিয়েছিল। অর্থাৎ ডেঙ্গুর ঝুঁকি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট মহল আগে থেকেই অবগত ছিল।

এরপরও ২০২৬ সালে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। ফলে এখন শুধু নতুন করে অভিযান চালানো নয়, আগের উদ্যোগগুলোর কার্যকারিতাও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

কোন এলাকায় মশার প্রজননস্থল শনাক্ত হয়েছিল? সেগুলো ধ্বংসের পর পুনরায় পরিদর্শন করা হয়েছিল কি না? আক্রান্তের তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল কি না? নিয়মিত মশক জরিপ বা লার্ভা শনাক্তকরণ কার্যক্রম কতটা হয়েছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি।
শুধু ‘সচেতন হোন’ ধরনের প্রচারণা দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের বাস্তব কার্যক্রম, নিয়মিত নজরদারি এবং কার্যক্রমের ফলাফল প্রকাশ।

দায় নির্ধারণের চেয়ে দায়িত্ব নির্ধারণ জরুরি
কোম্পানীগঞ্জে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় দায় একক কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়। এটি মূলত একটি সমন্বিত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার পরীক্ষা।

স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব: রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, রোগ নজরদারি এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তথ্য প্রদান।

উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্ব: সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বয় করে কার্যকর পরিকল্পনা, তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

পৌরসভার দায়িত্ব: ড্রেন, আবর্জনা ও জনসমাগমস্থল পরিষ্কার রাখা এবং নিয়মিত মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করা।

ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্ব: গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা।
জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব: জনগণকে সম্পৃক্ত করা এবং মাঠপর্যায়ের সমস্যা প্রশাসনের নজরে আনা।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব: দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে জনস্বাস্থ্য সংকটে কার্যকর ভূমিকা রাখা।

নাগরিকদের দায়িত্ব: বাড়ি ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া এবং ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

ডেঙ্গু বাড়ার পর নয়, আগেই প্রতিরোধ জরুরি
কোম্পানীগঞ্জে ডেঙ্গু নিয়ে এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন শুধু ‘দায় কার?’ নয়, বরং ‘কে কী দায়িত্ব পালন করেছে এবং কোথায় ঘাটতি রয়েছে?’

একজন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে তার আগেই যদি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা যায়, আক্রান্তের হটস্পট চিহ্নিত করা যায় এবং নিয়মিত মাঠপর্যায়ে নজরদারি চালানো যায়, তাহলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

তাই ডেঙ্গুতে মৃত্যুর পর দায় চাপানোর রাজনীতি নয়, প্রয়োজন আগাম প্রস্তুতি, নিয়মিত মশক নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং দৃশ্যমান জবাবদিহি।

কোম্পানীগঞ্জের মানুষ এখন সেটিই দেখতে চায়—ডেঙ্গু বাড়ার পর অভিযান নয়, ডেঙ্গু বাড়ার আগেই প্রতিরোধ।