নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলায় ভুয়া এতিমের তালিকা ও জাল বিল-ভাউচার তৈরি করে সরকারি অনুদানের ক্যাপিটেশন গ্রান্টের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে একাধিক এতিমখানার পরিচালকদের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত এতিম না থাকলেও কাগজপত্রে তাদের সংখ্যা দেখিয়ে এবং অস্তিত্বহীন বা সংশ্লিষ্ট নয় এমন প্রতিষ্ঠানের নামে বিল-ভাউচার তৈরি করে সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

সোনাইমুড়ী উপজেলায় মোট ১৮টি এতিমখানার মধ্যে ১৩টি সরকারি সহায়তা পায়। অনুসন্ধানে সোনাইমুড়ী ফয়েজিয়া এতিমখানা, পাঁচবাড়িয়া আহমাদিয়া এতিমখানা, জামেয়া ইসলামিয়া ইহাইয়া উল উলুম এতিমখানা, মকিল্যা নূরানী হাফেজিয়া এতিমখানা ও হোসেনপুর রহমানিয়া এতিমখানার সরকারি অনুদান গ্রহণের তথ্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে অসঙ্গতির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ফয়েজিয়া এতিমখানায় তালিকা ও ভাউচারে অসঙ্গতির অভিযোগ
অভিযোগের তালিকায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে সোনাইমুড়ী ফয়েজিয়া এতিমখানা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে ও পরে সভাপতি পদে পরিবর্তন হলেও মোহতামিম ও পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি পদে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছেন মো. শফিকুর রহমান।

সোনাইমুড়ী উপজেলা সমাজসেবা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটিতে ১৯০ জন নিবাসীর কথা উল্লেখ করে দুই ধাপে ১৪৬ জনের জন্য বরাদ্দ নেওয়া হয়। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে এই সংখ্যা ১০৮ জনে নেমে আসে। তবে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে আবার ১৫৬ জন নিবাসী দেখানো হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির বিল-ভাউচারে ‘ফয়সল ড্রাগ হাউজ’ থেকে ওষুধ কেনার কথা উল্লেখ থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. ফয়সাল দাবি করেন, তার প্রতিষ্ঠানের নামে জমা দেওয়া বিলগুলো জাল।

একইভাবে ‘মেসার্স আকবর স্টোর’-এর মালিক মো. হাফেজ শাহ আলমও তার প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা মুদি মালামাল ক্রয়ের বিলকে জাল বলে দাবি করেন।

এছাড়া সোনাইমুড়ী ব্যাংক রোডের ‘আনোয়ার ক্লথ স্টোর’ এবং রেলগেইট সোনাইমুড়ী কাঁচাবাজারের ‘মেসার্স মোহাম্মদীয়া বাণিজ্যালয়’-এর নামে বিল জমা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে অনুসন্ধানে এসব প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে।

ভাউচারে ব্যবহৃত একটি মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করলে মো. শফিকুর রহমানের ছবি প্রদর্শিত হয়।
৮৮ এতিমের তালিকায় উপস্থিত মাত্র ৩ জন
আমিশাপাড়া ইউনিয়নের জামেয়া ইসলামিয়া ইহাইয়া উল উলুম মাদ্রাসা ও এতিমখানায় ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ৮৮ জন এতিম নিবাসী দেখানো হলেও সরেজমিনে উপস্থিত পাওয়া যায় মাত্র তিনজনকে।

তাদের মধ্যে আসেক এলাহি ও আশিক বিন সাইফুল নামে দুই শিক্ষার্থীর বাবা প্রবাসী এবং তারা মাদ্রাসায় বেতন দিয়ে পড়াশোনা করছেন বলে জানা গেছে।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি মাওলানা কবির আহম্মেদ ও ক্যাশিয়ার মাওলানা বেল্লাল আপন চাচাতো ভাই বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এতিমখানাটির নামে ‘জনী ফার্মেসী’, ‘রাজমনি গার্মেন্টস’, ‘মেসার্স মনসুর আলী স্টোর’, ‘মেসার্স আলী হোসেন ফিস’, ‘হামিদিয়া লাইব্রেরী এন্ড স্টেশনারী’, ‘মেসার্স ওহাব গোস্ত দোকান’, ‘মেসার্স আবুল কাশেম ছ মিল’ এবং ‘এয়াকুব আলী সবজি দোকান’-এর নামে ভাউচার দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।

জনী ফার্মেসীর মালিক আবদুর রশিদ জনি এবং রাজমনি গার্মেন্টসের স্বত্বাধিকারী ইসমাইল হোসেন তাদের প্রতিষ্ঠানের নামে জমা দেওয়া বিলগুলো জাল বলে দাবি করেছেন। তবে প্রতিষ্ঠানটির মোহতামিম মাওলানা কবির আহম্মেদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। প্রতিষ্ঠানের সভাপতি মো. ইব্রাহীম দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ বলে জানা গেছে।

১২ জনের তালিকায় এতিম পাওয়া গেল একজন
বারগাঁও ইউনিয়নের মকিল্যা নূরানী হাফেজিয়া এতিমখানায় ১২ জন নিবাসীর তালিকা থাকলেও সরেজমিনে আমানত নামে একজনকে পাওয়া যায়।
প্রতিষ্ঠানটির মোহতামিম মুফতি মো. রফিকুল্লাহ জানান, আয়-ব্যয়ের হিসাব ও অর্থ উত্তোলনের কাজ করেন সাধারণ সম্পাদক মো. জসিম উদ্দিন।

এতিমখানাটির নামে ‘ফাতেমা বস্ত্র বিতান’, ‘মেসার্স আপন স্টোর’, সোনাইমুড়ী হাইস্কুল রোডের ‘মেসার্স প্রীতম মেডিকেল হল’ এবং ‘শহিদ ফেব্রিক্স’-এর নামে বিল জমা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের একটি দিক হলো, ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা ভাউচারগুলোর হাতের লেখা একই রকম।

৪৫ এতিমের তালিকায় উপস্থিত ৭ জন
সোনাইমুড়ী বাংলা বাজার এলাকার পাঁচবাড়িয়া আহমাদিয়া এতিমখানায় ৪৫ জন এতিমের তালিকা থাকলেও সরেজমিনে উপস্থিত পাওয়া যায় সাতজনকে।

এর মধ্যে কয়েকজনের বাবা প্রবাসী এবং কয়েকজনের বাবা ওই মাদ্রাসার শিক্ষক বলে জানা গেছে। আলী বিন জামালের বাবা ঢাকায় ব্যবসা করেন বলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তালিকায় থাকা মো. সাইমুন ও ইউসুফ হাসানকে প্রকৃত দরিদ্র ও এতিম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি মাকসুদুর রহমান পাটওয়ারীর নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘মাহী এন্টারপ্রাইজ’-এর নামে ভুয়া ভাউচার তৈরির অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়া ফিরোজ আলমের ‘ইসলাম মেডিকেল হল’ এবং বাংলা বাজার হাইস্কুল রোডের ‘রাজধানী ফ্যাশন’-এর নামেও ভুয়া বিল তৈরির অভিযোগ করা হয়েছে।
মাদ্রাসার সাধারণ শিক্ষক মিনহাজুল ইসলাম এসব ভাউচার সম্পাদনের কথা স্বীকার করেছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে এতিমখানার সেক্রেটারি আ. রশিদ জানান, এতিমদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ছাত্রদের জন্যই ব্যয় করা হয়েছে।

২০ জনের তালিকায় পাওয়া গেল একজন
কাশিপুর এলাকার হোসেনপুর রহমানিয়া এতিমখানায় ২০ জন এতিমের বিপরীতে সরেজমিনে একজনকে পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
প্রতিষ্ঠানটির ক্যাশিয়ার ওমর ফারুক শিপনের দাবি, বাকি ১৯ জন ছুটিতে রয়েছে। তিনি জানান, সভাপতি জসিম উদ্দিন বাদশাহ ও সেক্রেটারি গোলাম রসুল হোসেন চট্টগ্রামে থাকায় তাদের কাছ থেকে বিল-ভাউচারে স্বাক্ষর করিয়ে আনা হয়।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা
অভিযোগের বিষয়ে নোয়াখালী জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক জেড এম মিজানুর রহমান খান বলেন, এতিমদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। সমাজসেবা অধিদপ্তর এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নোট: প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তসাপেক্ষ।