দুর্ঘটনাস্থলে প্রাথমিক চিকিৎসা ও দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়ছে কমিউনিটি ফার্স্ট-রেসপন্ডারদের গুরুত্ব-
সড়কে দুর্ঘটনা ঘটেছে। মানুষ জড়ো হয়েছে। কেউ অ্যাম্বুলেন্সে ফোন করছেন, কেউ পুলিশকে খবর দিচ্ছেন। কিন্তু জীবন-মৃত্যুর সেই গুরুত্বপূর্ণ কয়েক মিনিটে আহত মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন এমন কিছু মানুষ, যাদের পেশা চিকিৎসা নয়—তারা প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক।
অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছানোর আগেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া, আহত ব্যক্তিকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর কাজে বাংলাদেশে কমিউনিটি ফার্স্ট-রেসপন্ডারদের ভূমিকা গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পরিচালিত একটি উদ্যোগে প্রশিক্ষিত কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবকেরা সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ৬২৫ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়েছেন। পরিস্থিতি অনুযায়ী তারা আহতদের দ্রুত শনাক্ত করে স্থানীয় পরিবহনের মাধ্যমে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থাও করেছেন। উদ্যোগটির সঙ্গে স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস ও হাইওয়ে পুলিশের মতো অংশীজনদের সমন্বয় ছিল।
কয়েক মিনিটই বদলে দিতে পারে পরিণতি
দুর্ঘটনার পর প্রথম কয়েক মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আহত ব্যক্তি অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, শ্বাসকষ্ট কিংবা শকে চলে গেলে দ্রুত প্রাথমিক সহায়তা পাওয়া তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এখানেই প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।
২০২৩ সালে বাংলাদেশে একটি পাইলট উদ্যোগে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ৫০ জনকে দুর্ঘটনাস্থলে প্রি-হসপিটাল কেয়ার ও সাইকোলজিক্যাল ফার্স্ট এইড বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে একটি ২৪ ঘণ্টার জরুরি কল সেন্টারও যুক্ত ছিল। ওই প্রকল্পে তিন-চতুর্থাংশের বেশি ক্ষেত্রে ফার্স্ট রেসপন্ডাররা পাঁচ মিনিটের মধ্যে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পেরেছিলেন।
অর্থাৎ, হাসপাতালের চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগেই একজন প্রশিক্ষিত মানুষ যদি আহত ব্যক্তির পাশে দাঁড়াতে পারেন, তাহলে জরুরি ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ দ্রুত শুরু করা সম্ভব।
শুধু উপস্থিতি নয়, দরকার প্রশিক্ষণ
তবে স্বেচ্ছাসেবক মানেই চিকিৎসক নন। দুর্ঘটনাস্থলে ভুলভাবে আহত ব্যক্তিকে সরানো কিংবা অপ্রশিক্ষিতভাবে চিকিৎসা করার চেষ্টা উল্টো ক্ষতির কারণ হতে পারে।
তাই স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য প্রয়োজন নিয়মিত প্রশিক্ষণ—প্রাথমিক চিকিৎসা, রক্তপাত নিয়ন্ত্রণ, সিপিআর, শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা মোকাবিলা, দুর্ঘটনাস্থলের নিরাপত্তা এবং আহত ব্যক্তিকে নিরাপদে স্থানান্তরের মতো বিষয়ে দক্ষতা।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ফার্স্ট এইড প্রশিক্ষণেও সিপিআর, রক্তপাত, ক্ষত, পোড়া, হাড়ের আঘাত এবং জরুরি অবস্থায় আহত ব্যক্তিকে পরিবহনের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
শহরের বাইরে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরাই হতে পারেন প্রথম সাড়া
দুর্ঘটনা শুধু বড় শহরে ঘটে না। মহাসড়ক, উপজেলা, গ্রামীণ সড়ক কিংবা প্রত্যন্ত এলাকায় অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে। এসব এলাকায় স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষিত মানুষ থাকলে তারাই প্রথমে ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেন।
এ কারণে কমিউনিটি-ভিত্তিক ফার্স্ট-রেসপন্ডার ব্যবস্থা শুধু দুর্ঘটনা মোকাবিলার বিষয় নয়; এটি একটি স্থানীয় জরুরি প্রতিক্রিয়া কাঠামো হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ১০৪ জন কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবককে অগ্নিনির্বাপণ, অনুসন্ধান ও উদ্ধার, প্রাথমিক চিকিৎসা, ভূমিকম্প ও ভূমিধস ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার তথ্য জানিয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা YPSA।
স্বেচ্ছাসেবা থেকে জরুরি সেবায়
একসময় স্বেচ্ছাসেবা বলতে মূলত ত্রাণ বিতরণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান কিংবা রক্তদানের মতো কার্যক্রমকেই বোঝানো হতো। এখন সেই ধারণা বদলাচ্ছে।
প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকেরা দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি নিচ্ছেন, দুর্ঘটনার পর দ্রুত সাড়া দিচ্ছেন এবং প্রয়োজন হলে আহত মানুষকে স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করছেন।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার পর জরুরি সেবা আরও সমন্বিত করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনটি জাতীয় মহাসড়ক করিডোরে ৬০টি বেসিক লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স, স্বেচ্ছাসেবক, পুলিশ ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
মানবিকতার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে দক্ষতা
একজন স্বেচ্ছাসেবকের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার মানবিক মন নয়; প্রয়োজনের মুহূর্তে সঠিক কাজটি করার দক্ষতাও।
দুর্ঘটনার পর ভিড় না বাড়িয়ে ঘটনাস্থল নিরাপদ রাখা, আহত ব্যক্তির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা, প্রশিক্ষণ অনুযায়ী প্রাথমিক সহায়তা দেওয়া এবং দ্রুত পেশাদার জরুরি সেবার সঙ্গে যোগাযোগ করাই হতে পারে একজন প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকের সবচেয়ে বড় ভূমিকা।
অ্যাম্বুলেন্সের বিকল্প স্বেচ্ছাসেবক নন। বরং অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছানোর আগের সময়টুকু নিরাপদভাবে কাজে লাগিয়ে তারা জরুরি সেবার প্রথম ধাপটি এগিয়ে নিতে পারেন।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—কে আগে পাশে দাঁড়াবে?
দুর্ঘটনার মুহূর্তে আহত মানুষের কাছে সময়ই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। সেই সময়ে কাছাকাছি থাকা একজন প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক হয়তো চিকিৎসা দিতে পারবেন না, কিন্তু সঠিক প্রাথমিক সহায়তা, দ্রুত যোগাযোগ ও নিরাপদ স্থানান্তরের মাধ্যমে জীবন রক্ষার সম্ভাবনা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারেন।
তাই ভবিষ্যতের স্বেচ্ছাসেবা শুধু মানবিক আবেগে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও সমন্বয়ের সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি।
কারণ জরুরি মুহূর্তে প্রশ্নটি সবসময় এমন নয়—“অ্যাম্বুলেন্স কখন আসবে?”
কখনো প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ—
“অ্যাম্বুলেন্স আসার আগ পর্যন্ত আহত মানুষের পাশে কে থাকবে?”
লেখক: মো. আব্দুল জাহিদ