নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে স্মারক নম্বর জালিয়াতি, সরকারি নথি গোপন, ঘুষ গ্রহণ, বিদ্যালয় পরিদর্শনে অনিয়ম, বদলি ও সংযুক্তিতে অনিয়ম, ভুয়া ভাউচার এবং তদন্ত প্রতিবেদন পরিবর্তনসহ নানা গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) মো. আব্দুল জব্বার ও উচ্চমান সহকারী মো. নাজিম উদ্দিন।

অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত পত্র প্রেরণ রেজিস্টারের ২৮৪ থেকে ৫৮৯ নম্বর পর্যন্ত ১৮ পৃষ্ঠা সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ৩৯টি স্মারকে শুধু নম্বর লেখা রয়েছে। তবে স্মারকের তারিখ, প্রাপক ও বিষয়—গুরুত্বপূর্ণ এসব ঘর ফাঁকা রাখা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, পরবর্তীতে সুবিধাজনক সময়ে এসব স্মারকে প্রয়োজনীয় তথ্য যুক্ত করে চিঠি জারি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন অনিয়ম ও অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, গত তিন বছরে এভাবে স্মারক ও সরকারি নথি ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষকদের ভয়ভীতি দেখানো, কৈফিয়ত তলব, তদন্ত প্রতিবেদন পরিবর্তন, বদলি ও সংযুক্তির প্রস্তাব এবং বাজেট ল্যাপস ঠেকানোর নামে অনিয়ম করা হয়েছে। বিদ্যুৎ, টিএ/ডিএ, ইন্টারনেট ও কন্টিনজেন্সি বিলসহ বিভিন্ন খাতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকজন ভুক্তভোগী লাখ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন।

স্মারকবিহীন কৈফিয়ত তলবের অভিযোগ

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, ২০২৪ সালের ৪ মার্চ তারিখ দিয়ে তাকে স্মারকবিহীন কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। তিনি ১৬ দিন পর নোটিশটি হাতে পান। পরে ১৯ মার্চ নোটিশটি গ্রহণ করে ২১ মার্চ উচ্চমান সহকারী মো. নাজিম উদ্দিনের কাছে জবাব জমা দেন।

নথিপত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল জব্বার সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে নিঝুম দ্বীপ বাতায়ন কিল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিককে ৮ জানুয়ারি এবং বসুন্ধরা গ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তামজিদ হোসেনকে ৫ জানুয়ারি থেকে অনুপস্থিত দেখিয়ে স্মারকবিহীন কৈফিয়ত তলব করেন।

এ ছাড়া মধ্য চর আমানুল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফয়সল ইসলামকেও ২০২৪ সালের ৪ মার্চ স্মারকবিহীন কৈফিয়ত তলব করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, তামজিদ হোসেন পাঁচ দিন অনুপস্থিত থাকার পর ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি কৈফিয়ত তলব করা হলেও তার বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি নিয়মিত বেতনও পেয়েছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এর পেছনে আর্থিক লেনদেন হয়েছিল। তবে এ দাবির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে আবু বক্কর সিদ্দিক ও ফয়সল ইসলামের কৈফিয়ত তলবের আদেশে পরে যথাক্রমে ৫২ ও ৩১৮ নম্বর স্মারক যুক্ত করে বিভাগীয় মামলার সুপারিশ করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদন ও নথি গোপনের অভিযোগ

দক্ষিণ রাজের হাওলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মফিজ উদ্দিনের শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিষয়ে ২০২৪ সালের ৯ জুন বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেন। পরে দুজন সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সরেজমিন তদন্ত করেন। ওই বছরের ২৪ জুন ০৯ নম্বর স্মারকে দেওয়া প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়া হাতিয়া শহর আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এ.এইচ.এম. আলাউদ্দিন ২০২৪ সালের ১২ জুন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে মফিজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব নথি গোপন রেখে অর্থের বিনিময়ে স্মারক জালিয়াতি করা হয়েছে।

বদলি ও সংযুক্তিতে অনিয়মের অভিযোগ

লম্বরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাত্র দুজন শিক্ষক কর্মরত থাকা অবস্থায় সহকারী শিক্ষক মিরাজ উদ্দিনকে মদনখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংযুক্তির আদেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

নোয়াখালী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) ইসরাত নাসিমা হাবীবের কার্যালয়ের ২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বরের ৩৫৪৩(৬) নম্বর পত্রে এ আদেশ দেওয়া হয়। অভিযোগ ওঠার প্রায় সাত মাস পর চলতি মাসে আদেশটি বাতিল করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এর আগে মধ্য চর আমানুল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফয়সল ইসলামকে সংযুক্তির জন্য ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ৬৫২ নম্বর পত্রে বিদ্যালয়ের তিনটি শূন্য পদের পরিবর্তে দুটি শূন্য পদ দেখিয়ে প্রস্তাব পাঠানোর অভিযোগ ওঠে। পরে ২ অক্টোবর সংযুক্তির আদেশ দেওয়া হয়। এরপর ৭ অক্টোবর ২০২৪ সালের ৭২১ নম্বর সংশোধনী প্রস্তাবের মাধ্যমে ওই আদেশ বাতিল করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা যায়।

দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থেকেও বেতন পাওয়ার অভিযোগ

কাউনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মহিমা বেগম ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলেও নিয়মিত বেতন পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

একইভাবে হাজী লাল মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোহাং মোশাররফ হোসেন ২০২৪ সালের ১১ থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত ১৬ দিন অনুপস্থিত থাকলেও তার কাছে মাত্র তিন দিনের কৈফিয়ত তলব করা হয়। পরে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে নিয়মিত বেতন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঘুষ না দেওয়ায় বেতন বন্ধের অভিযোগ

বাতায়ন কিল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিক অভিযোগ করেন, ২০২৩ সালের ২২ জানুয়ারি তিনি অন্যত্র বদলির আদেশ পান। তার দাবি, ২০ হাজার টাকা ঘুষ না দেওয়ায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল জব্বার ও উচ্চমান সহকারী মো. নাজিম উদ্দিন তাকে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগ দিতে বাধা দেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে আট মাস তার বেতন-ভাতা বন্ধ রাখা হয়।

আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, “এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি আমি অফিসে গেলে উচ্চমান সহকারী নাজিম উদ্দিন আমাকে চারতলা থেকে ফেলে দেওয়ার হুমকি দেন এবং অফিসে আর না আসতে বলেন। এ সময় সাবেক সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।”

তিনি আরও বলেন, “তাদের যোগসাজশে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) ইশরাত নাসিমা হাবীব উল্টো আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন। গত ১৮ আগস্ট শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে আমার বেতন গ্রেড এক ধাপ নিচে নামানোর লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।”

বিভাগীয় তদন্তে সাক্ষ্য নিয়েও প্রশ্ন

আরেক অভিযোগে বলা হয়েছে, মো. আব্দুল জব্বার ২০২২ সালে হাতিয়ায় কর্মরত না থাকলেও ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর ইউআরসি ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তে লিখিত সাক্ষ্য দেন।

ভুক্তভোগীর দাবি, শিক্ষক মফিজ উদ্দিন ও তৎকালীন সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুল হাসানের আনা অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল জব্বার অসত্য সাক্ষ্য দিয়েছেন।

তবে কামরুল হাসানের বিরুদ্ধেও ২০২২ সালের গণিত অলিম্পিয়াডের প্রশিক্ষণে অনুপস্থিত থেকেও ২১ হাজার ৬০০ টাকা গ্রহণ এবং একই সময়ে বিদ্যালয় পরিদর্শনের অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া আবু বক্কর সিদ্দিকের বিরুদ্ধে করা বিভাগীয় মামলার প্রতিবেদনে তার নিজের যোগদানের সাল এক বছর কম দেখিয়ে ২০২৪ সালে যোগদান করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।

বদলির আদেশ এক সপ্তাহেই বাতিল

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের ২০২৫ সালের ১৮ ও ২৫ নভেম্বরের দুটি অফিস আদেশে দেখা যায়, ১৮ নভেম্বর মো. আব্দুল জব্বারকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা শিক্ষা অফিসে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। এর এক সপ্তাহের মধ্যে ২৫ নভেম্বর ৫৮২ নম্বর পত্রে সেই আদেশ বাতিল করা হয়। এরপর তিনি হাতিয়ায় বহাল থাকেন।

নাজিম উদ্দিনের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ

উচ্চমান সহকারী মো. নাজিম উদ্দিনের বিরুদ্ধেও স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষকদের হয়রানি এবং বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তার প্রভাবের কারণে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী হাতিয়া ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

সাবেক হিসাব সহকারী মো. মেহেদী হাসান হাতিয়ায় দুই বছর তিন মাস কর্মরত থাকলেও তাকে কোনো কাজ বা কর্মবণ্টন আদেশ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, নাজিম উদ্দিন শিক্ষকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদের কাজ করে দিতেন এবং এর একটি অংশ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল জব্বারকে দিতেন। বিদ্যালয় পরিদর্শন ও তদন্তের সময়ও সুবিধাভোগী শিক্ষক প্রতিনিধিকে সঙ্গে নিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

এসব অনিয়মের বিরোধিতা করায় অফিস সহায়ক মো. আব্দুল লতিফকে নোয়াখালীর চাটখিলে বদলি করা হয়েছে বলেও ভুক্তভোগীদের দাবি।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) মো. আব্দুল জব্বার বলেন, “অফিসের ভালো-মন্দ বিষয় দেখার জন্য জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আছেন। আমরা সেখানে জবাবদিহি করব।”

নোয়াখালী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) ইসরাত নাসিমা হাবীবকে অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানানো হলে তিনি পরে এ বিষয়ে কথা বলবেন জানিয়ে ফোন রেখে দেন।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মনোয়ারা ইশরাত বলেন, “আমরা লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।”

অভিযোগকারীরা এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

তবে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং নথিপত্রের পূর্ণাঙ্গ যাচাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সুত্র-ঢাকা মেইল-
https://dhakamail.com/country/326367