বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)-এর বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ লুটপাটের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সবুজ উদ্দিন খান।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের-এর ঘনিষ্ঠ হিসেবে দীর্ঘদিন সওজে প্রভাব বিস্তার করেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে তিনি সওজে অত্যন্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
সরকার পরিবর্তনের পর তাকে ঢাকা সার্কেলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জয়দেবপুর-বেদগ্রাম-ভুলতা-মদনপুর বাইপাস প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ২০০৯ সালের পর নিজের পছন্দ অনুযায়ী সওজের মানিকগঞ্জ, গাজীপুর ও ঢাকা অঞ্চলে দীর্ঘসময় দায়িত্ব পালন করেন সবুজ খান।
প্রায় আট বছর তিনি অধিদপ্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা সার্কেলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।
ঠিকাদারি সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির অভিযোগ
সওজের একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে বিভিন্ন প্রকল্প থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
বিশেষ করে “আবেদ মনসুর কনস্ট্রাকশন লিমিটেড” নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অলিখিত মালিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন সবুজ খান। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের প্রকল্পকাজ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এছাড়া বদলি বাণিজ্য, প্রকল্প ব্যয়ের অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমেও শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে যেসব সম্পদের তথ্য
বিভিন্ন সূত্র ও অভিযোগপত্রে সবুজ খান ও তার পরিবারের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের তথ্য উঠে এসেছে।
এর মধ্যে রয়েছে:
রাজধানীর উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর রোডের ২৫ নম্বর বাড়ি, যার মালিকানা দেখানো হয়েছে স্ত্রী মাহমুদা আক্তার পান্না, শ্যালিকা নুরজাহান আক্তার ও নার্গিস আক্তার হীরার নামে।
উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের ২০ নম্বর রোডের ৫২ নম্বর বাসায় পরিবারের বর্তমান বসবাস, যার মূল্য কয়েক কোটি টাকা বলে জানা গেছে।
গুলশানে একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট।
পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার ঢালারচর ইউনিয়নের মীরপুর চরে প্রায় ১০০ বিঘা জমি।
স্ত্রী মাহমুদা আক্তার পান্নার নামে জাতসাখিনী ইউনিয়নের নান্দিয়ারা গ্রামে ৩০ বিঘা জমি।
গাজনার বিলে আরও প্রায় ৫০ বিঘা জমি।
আমিনপুর থানার মাসুন্দিয়া ইউনিয়নে প্রায় ২০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত ডুপ্লেক্স বাড়ি, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
একই এলাকায় “সিনথি পাঠশালা” নামে ৫০ বিঘা জমির ওপর স্কুল, মাঠ ও গরুর খামার।
শ্যামপুর, চর শ্যামপুর, দয়ালনগর, আমিরাবাদ, মালঞ্চি, বাদাই, শাতালী, তালিমনগর, চিনাখড়া ও কাশিনাথপুর-নান্দিয়ারা এলাকায় নামে-বেনামে আরও প্রায় ২০০ বিঘা জমি।
এছাড়া স্ত্রী ও দুই সন্তানের জন্য পৃথক গাড়ি রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান শুরু
সাম্প্রতিক সময়ে প্রকৌশলী সবুজ উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সূত্র জানিয়েছে, তার স্ত্রী মাহমুদা আক্তার, দুই ছেলে মারুফ হাসান খান ও সাফায়েত খান সিফাতসহ পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদ ও অর্থের উৎস খতিয়ে দেখতে বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ইতোমধ্যে দেশের বাইরে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারও করা হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
টিআইবির প্রতিবেদনে সওজের দুর্নীতি-
২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, গত ১৬ বছরে সড়ক খাতের বিভিন্ন প্রকল্প থেকে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। এতে রাষ্ট্রের প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ-
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সওজের কয়েকজন প্রকৌশলী অভিযোগ করেন, বিগত সরকারের সময়ে বিএনপিপন্থী কর্মকর্তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি ও নির্যাতন করেছেন সবুজ খান। তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া নিয়ে তারা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী অভিযোগ করেন, সাংবাদিকদের ফোন রিসিভ না করা এবং অসৌজন্যমূলক আচরণের জন্যও তিনি পরিচিত ছিলেন।
প্রকৌশলী সবুজ উদ্দিন খানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া
সম্পাদক হিমেল আহাম্মেদ কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত