বিশ্বজুড়ে কয়েক দশক ধরে ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নীতি অনুসরণ করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা দীর্ঘমেয়াদে সফল হয়নি।
বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময় কঠোর মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তবে বাস্তবতা বলছে, দমনমূলক পদক্ষেপ একা মাদক সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
মাদকাসক্তি বিষয়ক গবেষণা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাদক সমস্যা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
কেন মানুষ মাদকে আসক্ত হয়?
গবেষণায় উঠে এসেছে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য, মানসিক চাপ, পারিবারিক অস্থিরতা, একাকীত্ব, হতাশা এবং মানসিক অসুস্থতা মানুষকে মাদকের দিকে ঠেলে দেয়। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ মানসিক যন্ত্রণা থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে মাদকের আশ্রয় নেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আসক্তির ঝুঁকির বড় একটি অংশ জিনগত ও পরিবেশগত কারণের সঙ্গে সম্পর্কিত। মানসিক রোগ অনেক সময় দীর্ঘদিন অদৃশ্যভাবে বেড়ে ওঠে। সামাজিক লজ্জা ও সচেতনতার অভাবে অনেকে চিকিৎসা না নিয়ে নেশাজাতীয় দ্রব্যের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
আত্ম-চিকিৎসা ও মাদকের সম্পর্ক
বিশ্লেষকরা বলছেন, অনেক আসক্ত ব্যক্তি একধরনের ‘আত্ম-চিকিৎসা’র প্রবণতায় মাদক গ্রহণ করেন। যেমন কেউ ব্যথা কমাতে ওষুধ খায়, তেমনি কেউ মানসিক কষ্ট কমাতে মাদক ব্যবহার শুরু করে। কিন্তু এসব মাদক দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কঠোর অভিযান কেন ব্যর্থ হয়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল গ্রেপ্তার ও দমনমূলক অভিযানের মাধ্যমে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কারণ চাহিদা থাকলে কোনো না কোনোভাবে মাদকের জোগান তৈরি হয়।
সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালালে সাময়িকভাবে বাজারে সংকট তৈরি হলেও পরে নতুন চক্র গড়ে ওঠে। মাদকের দাম বেড়ে যাওয়ায় অপরাধ ও সহিংসতাও বাড়তে পারে। অন্যদিকে আসক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলে তারা চিকিৎসা ও পুনর্বাসন থেকে আরও দূরে সরে যায়।
বাজার বদলায়, মাদক বদলায়-
বিশ্বজুড়ে মাদকের বাজার ক্রমাগত রূপ বদলাচ্ছে। এক ধরনের মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালালে তার জায়গা নিচ্ছে নতুন ও আরও বিপজ্জনক মাদক। উত্তর আমেরিকায় ফ্যান্টানিলের বিস্তার কিংবা বাংলাদেশে ডান্ডি, গ্লু, ক্রিস্টাল মেথ ও এমডিএমএ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাকে এর উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা-
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দেশে লাখ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে মাদকাসক্তির সঙ্গে জড়িত। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক উদ্ধার হলেও মাদক প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
অন্যদিকে দেশে পর্যাপ্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র, কাউন্সেলিং ব্যবস্থা এবং ক্ষতি কমানোর স্বাস্থ্যসেবা এখনো সীমিত। ফলে অনেক আসক্ত ব্যক্তি চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন না।
করণীয় কী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক সমস্যার সমাধানে সমন্বিত ও গবেষণাভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে—
তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে সচেতনতামূলক ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ
চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার উন্নয়ন
গবেষণাভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়ন
ক্ষতি কমানোর (Harm Reduction) কার্যক্রম জোরদার করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদককে শুধু অপরাধ হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্য ও মানবিক সংকট হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। কেবল অভিযান নয়, প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, সহমর্মিতাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং কার্যকর পুনর্বাসন ব্যবস্থা।
সম্পাদক হিমেল আহাম্মেদ কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত