আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে ঘিরে চলছে প্রাক-বাজেট আলোচনা। সেই আলোচনায় উঠে এসেছে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কথা। যার প্রভাব তীব্র হয়ে উঠেছে বাংলাদেশে।
লোডশেডিংয়ের বিপরীতে জেনারেটর চালানোর জন্য পর্যাপ্ত ডিজেল মিলছে না। ডিজেল না পাওয়ায় উৎপাদন ও পণ্য শিপমেন্ট ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ইতোমধ্যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে সব মিলিয়ে গড়ে উৎপাদন সক্ষমতা কমেছে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। অন্যদিকে পোলট্রি খাতে গত পাঁচ বছরে উৎপাদন খরচ প্রায় ৯০ শতাংশ বেড়েছে। দেশের সব খাতেই উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে বলে জানিয়েছেন শিল্প উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা।
তাদের দাবি, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে উৎপাদন খরচ কমাতে করব্যবস্থা সহজীকরণ এবং নীতিগত সহায়তা দরকার। শিল্প খাত টিকিয়ে রাখতে সরকারের কাছে নীতি সহায়তাসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশের শিল্প খাতের উদ্যোক্তা এবং পোলট্র্রি শিল্পের নেতারা।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ায় তেল বাণিজ্যে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে টালমাটাল অবস্থা। এমন পরিস্থিতিতে আরও শঙ্কার কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি ২০২৬ সালের জন্য প্রবৃদ্ধির হার জানুয়ারির ৩.৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩.১ শতাংশ করেছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি চলতি বছরে ৪.৪ শতাংশে পৌঁছানোর পর আগামী বছরে ৩.৭ শতাংশে নেমে আসবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ।
মার্কিন হামলায় আক্রান্ত ইরান পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে এশিয়া ও ইউরোপের বেশির ভাগ দেশে জ¦ালানি পরিবহন বন্ধ। যার কারণে কাঁচামালের দাম ও পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে। সামগ্রিকভাবে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতে গড়ে উৎপাদন সক্ষমতা কমেছে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত।
অন্যদিকে পোলট্রি খাত ক্রমবর্ধমান খাদ্যের দাম এবং উচ্চ করের বোঝা এই খাতকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। গত পাঁচ বছরে উৎপাদন খরচ প্রায় ৯০ শতাংশ বেড়েছে। নতুন করে আরও বড়েছে উৎপাদন খরচ।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামী ১১ জুন বিএনপি সরকার প্রথম বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছে। জাতীয় সংসদ ভবনে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেট উপস্থাপন করা হবে।
শিল্প খাতের উদ্যোক্তাদের দাবি, পারস্য উপসাগরে নৌযান চলাচল বন্ধ হওয়ায় অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট এখন বাংলাদেশের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে। তাই শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা আসন্ন বাজেটে উৎপাদন খরচ কমানো, করব্যবস্থা সহজীকরণ এবং স্বল্প সুদে অর্থায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে সরকারকে অনুরোধ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের অধীনে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে। ব্যাবসায়িক নেতারা তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এবং নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের আহ্বান জানান। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকার একটি বড় বাজেট প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১২.৫ শতাংশ বেশি।
পোলট্র্রি খাতের গভীর সংকটের কথা উল্লেখ করে নেতারা বলেন, ‘পোলট্র্রি শিল্প বর্তমানে ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ক্রমবর্ধমান খাদ্যের দাম এবং উচ্চ করের বোঝা এই খাতকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। গত পাঁচ বছরে উৎপাদন খরচ প্রায় ৯০ শতাংশ বেড়েছে। নতুন করে আরও বেড়েছে উৎপাদন খরচ’।
তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে একটি ডিমের উৎপাদন খরচ সাড়ে ১০ থেকে ১১ টাকা, কিন্তু পাইকারি বাজারে এর দাম সাড়ে ১০ টাকা। একইভাবে ব্রয়লার মুরগির উৎপাদন খরচ প্রতি কেজি ১৪৬ টাকা হলেও পাইকারি দর ১৮০-১৯০ টাকা। এই লোকসানের কারণে শত শত খামার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যা দেশে প্রোটিন ঘাটতি এবং ব্যাপক বেকারত্ব সৃষ্টি করতে পারে।
পোলট্র্রি শিল্পের নেতারা করপোরেট কর ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা, ০.২ শতাংশ টার্নওভার ট্যাক্স এবং ফিড আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের দাবি জানিয়েছেন। পাকিস্তান, ভারত ও থাইল্যান্ডের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের পোলট্র্রি শিল্পে ব্যাপক নীতিগত সহায়তা দিলেও বাংলাদেশ এক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
শিল্প খাত টিকিয়ে রাখতে অর্থায়ন ও রপ্তানি সহায়তা দাবি করেন শাশা ডেনিমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে মূলধনী বিনিয়োগের ঋণের মেয়াদ মাত্র ৫-৬ বছর। যা প্রতিযোগী দেশগুলোর (১২-১৫ বছর) তুলনায় অনেক কম। উচ্চ সুদের হার এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণের কারণে ব্যবসা পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এসএমই খাতের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজের সুপারিশ করতে হবে।’
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান গত সোমবার এক বৈঠকে বলেন, ‘নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ক্রেতার আস্থা ফিরেছে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজার পুনরায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলো জ্বালানি নিরাপত্তায় এগিয়ে থাকার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এক নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েছে।’
‘চাহিদা মতো গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পাওয়ার কারণে বর্তমানে কারখানাগুলোতে উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে’ বলেন তিনি।
গাজীপুর ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের বিপরীতে জেনারেটর চালানোর জন্য পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় উৎপাদন ও পণ্য শিপমেন্ট ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কাঁচামালের দাম ও পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে।’
সম্পাদক হিমেল আহাম্মেদ কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত