আফনান মেহমুদ তান্নুর-
সহ-সভাপতি, গ্রীণ শ্যাডো সোসাইটি,-পরিচালক, অন্বেষা একাডেমিক কেয়ার
পহেলা বৈশাখ—একটি দিনের নাম নয়, এটি বাঙালির হৃদয়ের এক গভীর আবেগ, এক অনন্য সাংস্কৃতিক জাগরণ। বছরের প্রথম সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে যে নতুন দিনের আহ্বান ধ্বনিত হয়, তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে শতাব্দীর ঐতিহ্য, ইতিহাস আর অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল প্রকাশ।
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস আমাদের নিয়ে যায় মুঘল আমলে। সম্রাট আকবর কৃষিকাজ ও রাজস্ব ব্যবস্থাকে সহজ করার লক্ষ্যে যে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন, তা সময়ের স্রোতে বাঙালির নিজস্ব ক্যালেন্ডারে পরিণত হয়। কৃষকের জীবনে নতুন ফসলের আনন্দ, নতুন হিসাবের সূচনা—সব মিলিয়ে পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে নবজাগরণের প্রতীক। আজও সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা আমাদের সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত।
সংস্কৃতির রঙে রঙিন এই দিনটি যেন এক মিলনমেলা। ভোরের আলোয় রবীন্দ্রনাথের “এসো হে বৈশাখ” গান বাঙালির প্রাণে জাগায় নতুন উদ্দীপনা। লাল-সাদা শাড়িতে সজ্জিত নারীরা, পাঞ্জাবি-পায়জামায় পুরুষেরা, শিশুদের হাসি—সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয় এক আনন্দময় আবহ। মঙ্গল শোভাযাত্রা, আলপনা, লোকসংগীত—প্রতিটি উপাদানই বহন করে আমাদের ঐতিহ্যের বার্তা। এখানে ধর্ম-বর্ণের কোনো বিভাজন নেই; আছে শুধু একতার সৌন্দর্য।
ঐতিহ্যের এক অনন্য অংশ হলো “হালখাতা”। পুরনো হিসাবের সমাপ্তি ঘটিয়ে নতুন খাতার সূচনা, ক্রেতা-ব্যবসায়ীর আন্তরিক সম্পর্কের পুনর্নবীকরণ—এই প্রথা আমাদের সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে। পাশাপাশি গ্রামীণ বৈশাখী মেলা, পিঠা-পুলি, পালাগান ও নানান লোকজ শিল্প আমাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
তবে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে এই উৎসবের রূপেও কিছু পরিবর্তন এসেছে। নগরজীবনের ব্যস্ততায় অনেক সময় আমরা বাহ্যিক আনন্দেই সীমাবদ্ধ থাকি, অথচ এর অন্তর্নিহিত মূল্যবোধ—সহমর্মিতা, সাম্য, এবং মানবিকতা—ধীরে ধীরে আড়ালে পড়ে যায়। তাই প্রয়োজন নতুন প্রজন্মকে এই উৎসবের প্রকৃত অর্থের সঙ্গে পরিচিত করানো।
পহেলা বৈশাখ আমাদের শেখায়—পুরনো দুঃখ-গ্লানি ভুলে নতুন করে শুরু করার সাহস। এটি আমাদের ঐক্যের প্রতীক, আমাদের সংস্কৃতির গর্ব। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা শুধু ব্যক্তি নই, আমরা একটি বৃহৎ ঐতিহ্যের অংশ।
নতুন বছরের এই শুভক্ষণে আমাদের প্রত্যাশা—বাঙালির এই প্রাণের উৎসব যুগে যুগে অমলিন থাকুক, আমাদের সংস্কৃতি আরও সমৃদ্ধ হোক, আর আমরা যেন হৃদয়ের গভীর থেকে বলতে পারি—শুভ নববর্ষ।

