বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ হিসেবে এ দেশের ভূপ্রকৃতি নদী, মোহনা ও জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভরশীল।
নদী যেমন কৃষি ও অর্থনীতির প্রাণ, তেমনি নদীভাঙন ও লবণাক্ততা উপকূলীয় জনপদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের কারণ।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা নোয়াখালী বহু বছর ধরেই মেঘনা নদী ও ছোট ফেনী নদী-এর ভাঙন এবং জোয়ারের লবণাক্ততার সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে।
এই বাস্তবতায় মুছাপুর ক্লোজার ছিল লাখো মানুষের নিরাপত্তার প্রতীক। কিন্তু ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট কাঠামোগত ধস সেই নিরাপত্তা ভেঙে দেয়, সৃষ্টি করে নতুন সংকট।
নির্মাণ ইতিহাস ও উদ্দেশ্য-
ছোট ফেনী নদীর ভাঙন রোধে ১৯৬৫–৬৭ সালে কাজিরহাট এলাকায় একটি রেগুলেটর নির্মিত হলেও ২০০২ সালে তা নদীগর্ভে বিলীন হয়। পরে ২০০৪–০৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) মুছাপুরে ২৩ ভেন্টের রেগুলেটর ও প্রায় ১.০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ক্লোজার নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয়। ২০১৫–১৬ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়।
প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য ছিল—
জোয়ারের লবণাক্ত পানি নিয়ন্ত্রণ
মিঠা পানি সংরক্ষণ
বর্ষায় দ্রুত পানি নিষ্কাশন
উপকূলীয় কৃষি ও জনপদ সুরক্ষা
ক্লোজার চালু হওয়ার পর নোয়াখালী, ফেনী ও কুমিল্লার ১৪টি উপজেলার প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর জমি সেচ সুবিধার আওতায় আসে। কৃষি উৎপাদন ও শস্য নিবিড়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
বোরো ধানের পাশাপাশি গম, সরিষা, বাদাম ও তরমুজ চাষে ব্যাপক অগ্রগতি দেখা যায়। স্থানীয় অর্থনীতিও চাঙা হয়ে ওঠে। মাছের হ্যাচারি, গবাদিপশুর খামার, পোল্ট্রি শিল্প ও ক্ষুদ্র ব্যবসা সম্প্রসারিত হয়। বহু পরিবার স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করে।
একই সঙ্গে এটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও পরিচিতি পায়। বিস্তীর্ণ বালুচর ও নদীমোহনার সৌন্দর্যের কারণে স্থানীয়ভাবে একে “মিনি কক্সবাজার” বলা হতো। ছুটির দিনে হাজারো দর্শনার্থীর আগমন স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে।
ধস ও পরবর্তী পরিস্থিতি
২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট অস্বাভাবিক ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা প্রবল পানির চাপে ক্লোজারের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নকশাগত ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি পানি প্রবাহ এবং দীর্ঘ সময়ের চাপ কাঠামো দুর্বল করে দেয়।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি ও অবৈধ বালু উত্তোলন ভিত্তি ক্ষয়ের গতি বাড়িয়েছে।
ধসের পর কোম্পানীগঞ্জ ও সোনাগাজীর বিভিন্ন ইউনিয়নে নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। শত শত ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সড়ক অবকাঠামো। কৃষিজমি প্লাবিত হওয়ায় বোরো আবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে আশঙ্কা করা হচ্ছে, সেচ সুবিধা দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকলে রাষ্ট্রের হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞ মতামত ও করণীয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত ও টেকসই পুনর্নির্মাণ ছাড়া ভাঙনের ঝুঁকি বিস্তৃত হয়ে কয়েক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। উপকূলীয় অঞ্চল ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসপ্রবণ হওয়ায় শক্তিশালী বাঁধ ও আধুনিক জলনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
পুনর্নির্মাণ পরিকল্পনায় যেসব বিষয় অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত—
১. আধুনিক হাইড্রোলজিক্যাল ও জিওটেকনিক্যাল সমীক্ষা
২. গভীর ভিত্তি ও শক্তিশালী সুরক্ষা কাঠামো নির্মাণ
৩. অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর নজরদারি
৪. নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ
উপসংহার
মুছাপুর ক্লোজার কেবল একটি অবকাঠামো নয়, এটি উপকূলীয় জনজীবনের সুরক্ষা বলয়। কৃষি, অর্থনীতি, পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
পুনর্নির্মাণে বিলম্ব মানেই বহুগুণ ক্ষতির ঝুঁকি। ২৫ লক্ষ মানুষের জীবন ও জীবিকার স্বার্থে এখনই সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি।

