নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা থেকে বিদায় নিচ্ছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) রুবাইয়া বিনতে কাশেম। দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পূর্তি ও বিদায় উপলক্ষে দেওয়া এক দীর্ঘ বার্তায় তিনি ভূমি অফিসকে দালালমুক্ত, ঘুষমুক্ত ও জনবান্ধব করতে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ এবং এক বছরের কর্মযজ্ঞের কথা তুলে ধরেছেন।
রুবাইয়া বিনতে কাশেম বলেন, গত বছরের ঠিক এই দিনে কোম্পানীগঞ্জে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। দায়িত্ব নেওয়ার পর সেবাপ্রার্থী ও কর্মকর্তার মধ্যে দূরত্ব কমাতে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করেন।
ভূমি অফিসের বিভিন্ন স্থানে নোটিশ টানিয়ে অবৈধ লেনদেন থেকে বিরত থাকা এবং দালালের মাধ্যমে সেবা না নেওয়ার বিষয়ে জনগণকে সচেতন করার উদ্যোগ নেন।
তিনি জানান, গত এক বছরে কয়েক হাজার নামজারি মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত আবেদনকারীদের সরাসরি উপস্থিতিতে এক দিনে প্রায় ২১ থেকে ৫৪টি পর্যন্ত নামজারি ও জমা খারিজ মামলার শুনানি করেছেন। সরকার নির্ধারিত ২৮ দিনের মধ্যেই নামজারি সম্পন্ন করার চেষ্টা করেছেন বলেও জানান তিনি।
এ ছাড়া ২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৫০-৪০০টি মিস কেস ও রিভিউ আবেদনের শুনানি করেছেন। এর মধ্যে প্রায় ৬২টি মিস কেস চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী সপ্তাহে একদিন মিস কেস শুনানির কথা থাকলেও তিনি প্রতিদিন ২ থেকে ৬টি পর্যন্ত মিস কেস শুনানি করার চেষ্টা করেছেন বলে জানান।
ভূমি অফিসকে দালালমুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করে রুবাইয়া বিনতে কাশেম বলেন, জনগণ যাতে সরকার নির্ধারিত ১১৭০ টাকার সরকারি ফি দিয়েই নামজারি করতে পারেন, সে লক্ষ্যেই কাজ করেছেন।
শুনানির সময় সেবাগ্রহীতাদের কাউকে অতিরিক্ত টাকা না দেওয়ার জন্য সরাসরি সতর্ক করতেন তিনি। তার উদ্যোগের কারণে কয়েকজন দালাল সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে নেওয়া টাকা ফেরতও দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
রুবাইয়া বলেন, দালালমুক্ত ও ঘুষমুক্ত ভূমি অফিস গড়ে তুলতে গিয়ে তাকে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র ও প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগসহ নানা পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও তিনি বিষয়গুলো মহান আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।
এক বছরের দায়িত্ব পালনের সময়ে অফিসের নির্ধারিত সময়ের বাইরেও সেবাগ্রহীতাদের সেবা দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিদিন সকাল ৯টার আগেই অফিসে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। সন্ধ্যা ৬টা, ৭টা এমনকি রাত ৮টা পর্যন্তও সেবাগ্রহীতারা তার কাছে এসে সেবা পেয়েছেন।
তিনি জানান, গত এক বছরে প্রায় ২০০টি মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করেছেন। এর মধ্যে অবৈধ বালু উত্তোলন, ড্রাম ট্রাক চলাচল, ভেজাল খাদ্য, ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিৎসাসেবা, লাইসেন্সবিহীন ব্যবসা, মাটির টপসয়েল কাটা, বাজার মনিটরিং ও মাদকবিরোধী অভিযানসহ বিভিন্ন কার্যক্রম ছিল।
অফিস সময়ে জনগণের সেবা যেন ব্যাহত না হয়, সেজন্য অধিকাংশ মোবাইল কোর্ট বিকেল, সন্ধ্যা বা রাতে পরিচালনার চেষ্টা করেছেন বলেও জানান তিনি।
এ ছাড়া জাতীয় দিবস, বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠান, অভিভাবক সমাবেশ, কুইজ ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞান মেলা, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিতরণ, ম্যাজিস্ট্রেসি দায়িত্ব পালন, নদীতে মৎস্য অভিযান, ভূমিহীনদের যাচাই-বাছাই, সরেজমিনে দখল পরিদর্শন, মব নিয়ন্ত্রণ, পূজার দায়িত্ব পালন এবং বিভিন্ন আন্দোলন-সমাবেশ নিয়ন্ত্রণসহ নানা সরকারি দায়িত্ব পালনের কথা তুলে ধরেন তিনি।
জাতীয় নির্বাচন-২০২৬ উপলক্ষে কোম্পানীগঞ্জের ৭০টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৬৮টি কেন্দ্র পরিদর্শন এবং নির্বাচনের দিন চর এলাহী ও চর ফকিরাতে ম্যাজিস্ট্রেসি দায়িত্ব পালনের কথাও জানান বিদায়ী এই কর্মকর্তা।
সরকারের রাজস্ব আদায় নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন উল্লেখ করে রুবাইয়া বিনতে কাশেম গত তিন বছরের রাজস্ব আদায়ের তুলনামূলক চিত্র সংযুক্ত করার কথা জানান।
বিদায় বার্তায় কোম্পানীগঞ্জবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, প্রবাসীসহ সর্বস্তরের মানুষ তাকে যে পরিমাণ সহযোগিতা ও ভালোবাসা দিয়েছেন, তা তার কাছে অকল্পনীয়। একই সঙ্গে নোয়াখালী-৫ আসনের সংসদ সদস্য, দুইজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সাংবাদিক, শিক্ষক-শিক্ষিকা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাসহ সর্বস্তরের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
রুবাইয়া বিনতে কাশেম বলেন, মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী ন্যায়সংগত কাজগুলো করার চেষ্টা করেছেন। সময় স্বল্পতা কিংবা নীতিবহির্ভূত হওয়ায় যেসব অনুরোধ রাখতে পারেননি, সেজন্য দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।
বিদায়ী বার্তার শেষাংশে কোম্পানীগঞ্জবাসীর কাছে নিজের জন্য দোয়া চেয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতের পথচলা যেন মহান আল্লাহ সহজ করে দেন।
সম্পাদক হিমেল আহাম্মেদ কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত